হোম / আকিদা-বিশ্বাস / সাহাবায়ে কেরাম রাঃ থেকে কারামাত সম্পর্কিত কোন ঘটনা সংঘটিত হয়নি?

সাহাবায়ে কেরাম রাঃ থেকে কারামাত সম্পর্কিত কোন ঘটনা সংঘটিত হয়নি?

প্রশ্ন

আস্‌সালামু আলাইকুম

হুজুর আমাকে এক আহলে হাদীস ভাই বললেন যে, সাহাবাদের মাধ্যমে নাকি কোন কেরামত সংঘটিত হয়েছে এর কোন প্রমান নেই , তার কথা কী সত্য একটু বিস্তারিত জানাবেন ।

উত্তর

وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته

بسم الله الرحمن الرحيم

এটি ঐ ভাইয়ের সাহাবা জীবন  চরিত সম্পর্কে পড়াশোনা না থাকায় এমন কথা তিনি বলেছেন। তাকে বলুন সাহাবীদের জীবনী পড়তে। তাহলে তিনি তার এ অজ্ঞতাসূচক বক্তব্য থেকে ফিরে আসবেন।

সাহাবায়ে কেরামের জীবনে অসংখ্য কারামাতের ঘটনা সংঘটিত হয়েছে।

শুধু কোন ব্যক্তি যদি কুতুবে সিত্তার হাদীসগুলোও পড়ে, তাহলেই তার নজরে পড়বে সাহাবীদের অসংখ্য কারামাতের ঘটনা। হাদীসের কিতাব সম্পর্কে সামান্য সম্পর্কও যার আছে তিনি এমন  বোকামীসূলভ বক্তব্য দিতেই পারেন না।

তাই উপরোক্ত  ভাই নামের আহলে হাদীস হলেও সত্যিকার আহলে হাদীস নন।

সাহাবীদের কারামাতের উপর আলাদা কিতাবও রচিত হয়েছে। যেমন-কারামাতুল আওলিয়া, ইমাম লালকাইকৃত।

উক্ত কিতাবে সাহাবায়ে কেরামের অসংখ্য কারামাতের কথা সহীহ সনদে বিধৃত করা হয়েছে।

এছাড়া সহীহ বুখারী, সহীহ মুসলিম, সুনানে আবু দাউদ, দালায়েলুন নবুয়্যাহ লিলবায়হাকী, দালায়েলুন নবুয়্যাহ লিইবনে নুজাইম, মাজমূউল ফাতাওয়া ইবনে তাইমিয়া, কিতাবুর রূহ ইবনে কাইয়্যিমকৃত, ইহয়াউ উলুমিদ্দীন ইমাম গাযালীকৃত এবং ইমাম নববীকৃত বুস্তানুল আরেফীন কিতাবগুলো যদি কেউ পড়ে থাকেন, তিনি এমন হাস্যকর দাবী করতেই পারেন না।

উদাহরণতঃ

وقال أبو بكر الصديق رضي الله عنه لعائشة رضي الله عنها عند موته إنما هما أخواك وأختاك وكانت زوجته حاملاً فولدت بنتاً فكان قد عرف قبل الولادة أنها بنت

হযরত আবু বকর সিদ্দীক রাঃ তার কন্যা আয়শা রাঃ মৃত্যুর সময় বললেন, তোমার ভাই এবং তোমার দুই বোন। [অথচ সে ময় বোন ছিল একজন] সে সময় আবু বকর রাঃ এর স্ত্রী গর্ভবতী ছিলেন। [আবু বকর সিদ্দীক রাঃ এর ইন্তেকালের পর] তারপর তার স্ত্রী কন্যা সন্তান প্রসব করেন। অথচ জন্ম গ্রহণের আগেই আবু বকর রাঃ কন্যা সন্তান হবার বিষয়টি জানতে পেরেছিলেন। [ইহয়াউ উলুমিদ্দীন-৩/২৩]

আবু বকর সিদ্দীক রাঃ এর উক্ত ঘটনা ইমাম মালিক রহঃ তার বিখ্যাত গ্রন্থ “মুয়াত্তা মালিক” এর মাঝেও সনদসহ নকল করেছেন। দেখুন মুয়াত্তা মালিক-৩১৪, ভিন্ন ছাপা, হাদীস নং-২৭৮৩]

লা-মাযহাবী বন্ধুদের নিজস্ব প্রকাশনী “তাওহীদ পাবলিকেশন্স” থেকে আক্বিদা বিষয়ক একটি বই প্রকাশিত হয়েছে। যার মূল লেখক হাফেজ বিন আহমাদ বিন আল-হাকামী। আর অনুবাদ করেছেন লা-মাযহাবী শায়েখ আব্দুল্লাহ শাহেদ মাদানী। বইটির নাম হল, ‘কুরআন ও সহীহ হাদীসের আলোকে দুই শতাধিক প্রশ্নোত্তরসহ নাজাতপ্রাপ্ত দলের আকীদাহ’।

উক্ত বইয়ে কারামত সত্য হবার প্রমাণ দিতে গিয়ে ২৮২ নং পৃষ্ঠায় ৩২২ নং টিকায় আনা হয়েছে “সারিয়ার সাথে উমার রাঃ এর কারামাতের বিস্তারিত বিবরণ এই যে, উমার রাঃ একদল সৈনিক পাঠালেন এবং সারিয়া নামক এক ব্যক্তিকে সেনাবাহীনীর আমীর নিযুক্ত করলেন। উমার রাঃ মদীনার মিম্বরে খুৎবারত অবস্থায় ইয়া সারিয়া! আল জাবাল! বলে উচ্চসরে ডাক দিলেন। সৈনিকদের দূত মদীনায় এসে বললেন, হে আমীরুল মুমিনীন! আমরা শত্রুদের মুকাবিলা করতে গেলে তারা আমাদেরকে পরাজিত করে ফেলে। তখন আমরা একজন লোককে চিৎকার করে বলতে শুনলামঃ ইয়া সারিয়া! আল জাবাল! অর্থাৎ হে সারিয়া পাহাড়ে আশ্রয় নাও। এতে আমরা সতর্কতা অবলম্বন করে পাহাড়ে আশ্রয় গ্রহণ করলাম। শত্রুদের আক্রমণের কবল হতে নিরাপদ হলাম। আল্লাহ তাআলা শত্রুদেরকে পরাজিত করলেন। [মাজমূআয়ে ফাতাওয়া ইবনে তাইমিয়া-১১/২৭৮]

হাজার মাইল দূরের সৈন্যবাহিনীকে দেখে মসজিদের মিম্বরে বসে দিকনির্দেশনা দেয়ার নাম কি? কারামত নয়?

ইমাম নববী রহঃ, ইমাম ইবনে কাইয়্যিম রহঃ, ইমাম কুরতুবী রহঃ, ইমাম রাজী রহঃ, ইমাম গাযালী রহঃ এ ৫ জন ইমাম হযরত উসমান রাঃ এর একটি ঘটনা নকল করেছেন।

قال دخلت على عثمان رضي الله عنه وكنت قد لقيت امرأة في طريقي فنظرت إليها شزراً وتأملت محاسنها فقال عثمان رضي الله عنه لما دخلت يدخل علي أحدكم وأثر الزنا ظاهر على عينيه أما علمت أن زنا العينين النظر لتتوبن أولأعزرنك فقلت أوحي بعد النبي فقال لا ولكن بصيرة وبرهان وفراسة صادقة

তিনি বলেন, আমি হযরত উসমান রাঃ এর নিকট আসলাম। পথিমধ্যে আমি এক নারীর সাথে সাক্ষাৎ হল। তখন আমি তার দিকে আড়চোখে তাকালাম। আর তার সৌন্দর্যতা গভীরভাবে নিরীক্ষণ করলাম। এরপর হযরত হযরত উসমান রাঃ এর খিদমাতে উপস্থিত হলে, তিনি আমাকে বললেন, তোমাদের কেউ কেউ আমার কাছে আগমন করে এমতাবস্থায় যে, তার চোখে মুখে যিনার চিহ্ন থাকে। তোমার কি জানা নেই যে, কুদৃষ্টি করা হচ্ছে চোখের যিনা? তুমি তওবা কর। নতুবা তোমাকে সাজা দেব। আমি জিজ্ঞাসা করলামঃ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর পরেও ওহী আগমন করে কি? তিনি বললেন, না, কিন্তু অন্তর্দৃষ্টি ও দূরদর্শীতার মাধ্যমে জানা যায়।

ইহয়াউ উলুমিদ্দীন-৩/২৩-২৪। তাফসীরে কুরতুবী-১২/২৩৬। তাফসীরে রাজী-২১/৮৯। কিতাবুর রূহ-২৮৯, ভিন্ন ছাপা-৬৭৫। বুস্তানুল আরেফীন-৩৮৮।

ইবনে হাজার আসকালানী রহঃ হযরত আলী রাঃ এর বিষয়ে একটি ঘটনা নকল করেন। যাতে এসেছেঃ

হারছামা বিন সালমা রহঃ বলেন, আমরা হযরত আলী রাঃ এর সাথে সফরে বের হলাম। তিনি চলতে চলতে কারবালায় গিয়ে পৌঁছলেন। সেখানকার এক গাছের নিচে গিয়ে নামলেন। তারপর নামায পড়লেন। নামায শেষে জমিন থেকে কিছু মাটি হাতে নিয়ে ঘ্রাণ নিলেন। তারপর বললেন, ‘হে মাটি! তোমার জন্য আফসোস! তোমার উপর এমন কিছু লোককে হত্যা করা হবে, যারা বিনা হিসেবে জান্নাতে গমণ করবে।’

এরপর রাবী নিজেই বলেন যে, আমি নিজে দেখেছি যে, উক্ত স্থানেই হযরত হুসাইন রাঃ শহীদ হয়েছিলেন। [তাহযীবুত তাহযীব-২/২০২, ভিন্ন ছাপা-২/৩৪৮]

عَنْ أَنَسٍ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ: «أَنَّ رَجُلَيْنِ، خَرَجَا مِنْ عِنْدِ النَّبِيِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فِي لَيْلَةٍ مُظْلِمَةٍ وَإِذَا نُورٌ بَيْنَ أَيْدِيهِمَا، حَتَّى تَفَرَّقَا، فَتَفَرَّقَ النُّورُ مَعَهُمَا

হযরত আনাস রাঃ থেকে বর্ণিত। দুইজন ব্যক্তি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কাছে বের হল অন্ধকার রাতে। তখন তারা তাদের সামনে একটি আলো দেখতে পেল। [যে আলোতে তারা চলতে লাগল] যখন তারা পরস্পর পৃথক হল, তখন আলোও পৃথক হয়ে তাদের সাথে চলতে লাগল। [বুখারী, হাদীস নং-৩৮০৫]

এই দুই সাহাবীর নাম ছিল, উসাইদ বিন হুজাইর রাঃ এবং আব্বাদ বিন বিশর রাঃ।  এটা কি উক্ত সাহাবীর কারামত নয়?

বুখারীতে বর্ণিত একটি দীর্ঘ হাদীস রয়েছে। যাতে সাদ বিন ওয়াক্কাস রাঃ এর উপর এক মিথ্যুক অপবাদ দেয়। যার জবাবে হযরত সাদ তার জন্য তিনটি বদদুআ করেন।

فَقَامَ رَجُلٌ مِنْهُمْ يُقَالُ لَهُ أُسَامَةُ بْنُ قَتَادَةَ يُكْنَى أَبَا سَعْدَةَ قَالَ: أَمَّا إِذْ نَشَدْتَنَا فَإِنَّ سَعْدًا كَانَ لاَ يَسِيرُ بِالسَّرِيَّةِ، وَلاَ يَقْسِمُ بِالسَّوِيَّةِ، وَلاَ يَعْدِلُ فِي القَضِيَّةِ، قَالَ سَعْدٌ: أَمَا وَاللَّهِ لَأَدْعُوَنَّ بِثَلاَثٍ: اللَّهُمَّ إِنْ كَانَ عَبْدُكَ هَذَا كَاذِبًا، قَامَ رِيَاءً وَسُمْعَةً، فَأَطِلْ عُمْرَهُ، وَأَطِلْ فَقْرَهُ، وَعَرِّضْهُ بِالفِتَنِ، وَكَانَ بَعْدُ إِذَا سُئِلَ يَقُولُ: شَيْخٌ كَبِيرٌ مَفْتُونٌ، أَصَابَتْنِي دَعْوَةُ سَعْدٍ، قَالَ عَبْدُ المَلِكِ: فَأَنَا رَأَيْتُهُ بَعْدُ، قَدْ سَقَطَ حَاجِبَاهُ عَلَى عَيْنَيْهِ مِنَ الكِبَرِ، وَإِنَّهُ لَيَتَعَرَّضُ لِلْجَوَارِي فِي الطُّرُقِ يَغْمِزُهُنَّ

এখানে উসামা ইবনু কাতাদাহ্ নামে এক ব্যক্তি যাকে আবূ সা‘দাহ্ বলে ডাকা হত- দাঁড়িয়ে বলল, যেহেতু তুমি আল্লাহর নামের শপথ দিয়ে জিজ্ঞেস করেছ, সা‘দ (রাযি.) কখনো সেনাবাহিনীর সঙ্গে যুদ্ধে যান না, গানীমাতের মাল সমভাবে বণ্টন করেন না এবং বিচারে ইনসাফ করেন না। তখন সা‘দ (রাযি.) বললেন, মনে রেখো, আল্লাহর কসম! আমি তিনটি দু‘আ করছিঃ হে আল্লাহ্! যদি তোমার এ বান্দা মিথ্যাবাদী হয়, লোক দেখানো এবং আত্মপ্রচারের জন্য দাঁড়িয়ে থাকে তাহলে- ১. তার হায়াত বাড়িয়ে দিন, ২. তার অভাব বাড়িয়ে দিন এবং ৩. তাকে ফিতনার সম্মুখীন করুন। পরবর্তীকালে লোকটিকে (তার অবস্থা সম্পর্কে) জিজ্ঞেস করা হলে সে বলতো, আমি বয়সে বৃদ্ধ, ফিতনায় লিপ্ত। সা‘দ (রাযি.)-এর দু‘আ আমার উপর লেগে আছে। বর্ণনাকারী আবদুল মালিক (রহ.) বলেন, পরে আমি সে লোকটিকে দেখেছি, অতি বৃদ্ধ হয়ে যাওয়ার কারণে তার ভ্রু চোখের উপর ঝুলে গেছে এবং সে পথে মেয়েদের বিরক্ত করত এবং তাদের চিমটি দিত। [সহীহ বুখারী, হাদীস নং-৭৫৫]

হযরত সাদ রাঃ যা বলেছিলেন, তাই ফলে যাওয়া কি উক্ত সাহাবীর কারামত নয়?

عَنْ أُسَيْدِ بْنِ حُضَيْرٍ، قَالَ: بَيْنَمَا هُوَ يَقْرَأُ مِنَ اللَّيْلِ سُورَةَ البَقَرَةِ، وَفَرَسُهُ مَرْبُوطَةٌ عِنْدَهُ، إِذْ جَالَتِ الفَرَسُ فَسَكَتَ فَسَكَتَتْ، فَقَرَأَ فَجَالَتِ الفَرَسُ، فَسَكَتَ وَسَكَتَتِ الفَرَسُ، ثُمَّ قَرَأَ فَجَالَتِ الفَرَسُ فَانْصَرَفَ، وَكَانَ ابْنُهُ يَحْيَى قَرِيبًا مِنْهَا، فَأَشْفَقَ أَنْ تُصِيبَهُ فَلَمَّا اجْتَرَّهُ رَفَعَ رَأْسَهُ إِلَى السَّمَاءِ، حَتَّى مَا يَرَاهَا، فَلَمَّا أَصْبَحَ حَدَّثَ النَّبِيَّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَقَالَ: اقْرَأْ يَا ابْنَ حُضَيْرٍ، اقْرَأْ يَا ابْنَ حُضَيْرٍ، قَالَ: فَأَشْفَقْتُ يَا رَسُولَ اللَّهِ أَنْ تَطَأَ يَحْيَى، وَكَانَ مِنْهَا قَرِيبًا، فَرَفَعْتُ رَأْسِي فَانْصَرَفْتُ إِلَيْهِ، فَرَفَعْتُ رَأْسِي إِلَى السَّمَاءِ، فَإِذَا مِثْلُ الظُّلَّةِ فِيهَا أَمْثَالُ المَصَابِيحِ، فَخَرَجَتْ حَتَّى لاَ أَرَاهَا، قَالَ: «وَتَدْرِي مَا ذَاكَ؟»، قَالَ: لاَ، قَالَ: «تِلْكَ المَلاَئِكَةُ دَنَتْ لِصَوْتِكَ، وَلَوْ قَرَأْتَ لَأَصْبَحَتْ يَنْظُرُ النَّاسُ إِلَيْهَا، لاَ تَتَوَارَى مِنْهُمْ»

উসাইদ ইবনু হুযায়র (রাঃ) হতে বর্ণিত যে, একদা রাত্রে তিনি সুরা বাকারা পাঠ করছিলেন। তখন তাঁর ঘোড়াটি তারই পাশে বাঁধা ছিল। হঠাৎ ঘোড়াটি ভীত হয়ে লাফ দিয়ে উঠল এবং ছুটাছুটি শুরু করল। যখন পাঠ বন্ধ করলেন তখনই ঘোড়াটি শান্ত হল। আবার পাঠ শুরু করলেন। ঘোড়াটি আগের মত করল। যখন পাঠ বন্ধ করলেন ঘোড়াটি শান্ত হল। আবার পাঠ আরম্ভ করলে ঘোড়াটি আগের মত করতে লাগল। এ সময় তার পুত্র ইয়াহইয়া ঘোড়াটির নিকটে ছিল। তার ভয় হচ্ছিল যে, ঘোড়াটি তার পুত্রকে পদদলিত করবে। তখন তিনি পুত্রকে টেনে আনলেন এবং আকাশের দিকে তাকিয়ে কিছু দেখতে পেলেন। পরদিন সকালে তিনি রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে উক্ত ঘটনা বললেন। ঘটনা শুনে নাবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ হে ইবনু হুদায়র (রাঃ)! তুমি যদি পাঠ করতে, হে ইবনু হুদায়র (রাঃ)! তুমি যদি পাঠ করতে। ইবনু হুযায়র আরয করলেন, আমার ছেলেটি ঘোড়ার নিকট থাকায় আমি ভয় পেয়ে গেলাম হয়ত বা ঘোড়াটি তাকে পদদলিত করবে, সুতরাং আমি আমার মাথা উপরে উঠাতেই মেঘের মত কিছু দেখলাম, যা আলোর মত ছিল। আমি যখন বাইরে এলাম তখন আর কিছু দেখ্লাম না। তখন নাবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তুমি কি জান, ওটা কী ছিল? বললেন, না। তখন নাবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তারা ছিল মালায়িকাহ। তোমার তিলাওয়াত শুনে তোমার কাছে এসেছিল। তুমি যদি সকাল পর্যন্ত তিলাওয়াত করতে তারাও ততক্ষণ পর্যন্ত এখানে অবস্থান করত এবং লোকেরা তাদেরকে দেখতে পেত। [সহীহ বুখারী, হাদীস নং-৫০১৮]

কুরআন তিলাওয়াত শুনে আসমান থেকে ফেরেশতা নেমে আসা এটি কি উক্ত সাহাবীর কারামত নয়?

হযরত খুবাইব রাঃ এর বন্দিত্ব সম্পর্কিত একটি দীর্ঘ হাদীসের অংশ বিশেষে দেখুনঃ

فَأَخْبَرَنِي عُبَيْدُ اللَّهِ بْنُ عِيَاضٍ، أَنَّ بِنْتَ الحَارِثِ أَخْبَرَتْهُ: أَنَّهُمْ حِينَ اجْتَمَعُوا اسْتَعَارَ مِنْهَا مُوسَى يَسْتَحِدُّ بِهَا، فَأَعَارَتْهُ، فَأَخَذَ ابْنًا لِي وَأَنَا غَافِلَةٌ حِينَ أَتَاهُ قَالَتْ: فَوَجَدْتُهُ مُجْلِسَهُ عَلَى فَخِذِهِ وَالمُوسَى بِيَدِهِ، فَفَزِعْتُ فَزْعَةً عَرَفَهَا خُبَيْبٌ فِي وَجْهِي، فَقَالَ: تَخْشَيْنَ أَنْ أَقْتُلَهُ؟ مَا كُنْتُ لِأَفْعَلَ ذَلِكَ، وَاللَّهِ مَا رَأَيْتُ أَسِيرًا قَطُّ خَيْرًا مِنْ خُبَيْبٍ، وَاللَّهِ لَقَدْ وَجَدْتُهُ يَوْمًا يَأْكُلُ مِنْ قِطْفِ عِنَبٍ فِي يَدِهِ، وَإِنَّهُ لَمُوثَقٌ فِي الحَدِيدِ، وَمَا بِمَكَّةَ مِنْ ثَمَرٍ، وَكَانَتْ تَقُولُ: إِنَّهُ لَرِزْقٌ مِنَ اللَّهِ رَزَقَهُ خُبَيْبًا،

ইবনু শিহাব (রহ.) বলেন, আমাকে উবায়দুল্লাহ ইবনু আয়ায্ অবহিত করেছেন, তাঁকে হারিসের কন্যা জানিয়েছে যে, যখন হারিসের পুত্রগণ খুবাইব (রাঃ)-কে শহীদ করার সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত নিল, তখন তিনি তার কাছ থেকে ক্ষৌর কাজ সম্পন্ন করার উদ্দেশে একটা ক্ষুর ধার চাইলেন। তখন হারিসের কন্যা তাকে একখানা ক্ষুর ধার দিল। সে সময় ঘটনাক্রমে আমার এক ছেলে আমার অজ্ঞাতে খুবাইবের নিকট চলে যায় এবং আমি দেখলাম যে, আমার ছেলে খুবাইবের উরুর উপর বসে রয়েছে এবং খুবাইবের হাতে রয়েছে ক্ষুর। আমি খুব ভয় পেয়ে গেলাম। খুবাইব আমার চেহারা দেখে বুঝতে পারলেন যে, আমি ভয় পাচ্ছি। তখন তিনি বললেন,তুমি কি এ ভয় করো যে,আমি এ শিশুটিকে হত্যা করে ফেলব? কখনো আমি তা করব না। আল্লাহর কসম! আমি খুবাইবের মত উত্তম বন্দী কখনো দেখিনি। আল্লাহর শপথ! আমি একদা দেখলাম,তিনি লোহার শিকলে আবদ্ধ অবস্থায় ছড়া হতে আঙ্গুর খাচ্ছেন,যা তাঁর হাতেই ছিল। অথচ এ সময় মক্কা্য় কোন ফলই পাওয়া যাচ্ছিল না। হারিসের কন্যা বলতো,এ তো ছিল আল্লাহ তা‘আলার পক্ষ হতে প্রদত্ত জীবিকা,যা তিনি খুবাইবকে দান করেছেন। [সহীহ বুখারী, হাদীস নং-৩০৪৫]

শিকলে আবদ্ধ অবস্থায় অমৌসুমী ফল খাওয়ার নাম কি কারামত নয়?

وَعَنْ أَبِي أُسَامَةَ، قَالَ: قَالَ هِشَامُ بْنُ عُرْوَةَ، فَأَخْبَرَنِي أَبِي، قَالَ: لَمَّا قُتِلَ الَّذِينَ بِبِئْرِ مَعُونَةَ، وَأُسِرَ عَمْرُو بْنُ أُمَيَّةَ الضَّمْرِيُّ، قَالَ: لَهُ عَامِرُ بْنُ الطُّفَيْلِ مَنْ هَذَا؟ فَأَشَارَ إِلَى قَتِيلٍ، فَقَالَ لَهُ عَمْرُو بْنُ أُمَيَّةَ: هَذَا عَامِرُ بْنُ فُهَيْرَةَ، فَقَالَ: لَقَدْ رَأَيْتُهُ بَعْدَ مَا قُتِلَ رُفِعَ إِلَى السَّمَاءِ، حَتَّى إِنِّي لَأَنْظُرُ إِلَى السَّمَاءِ بَيْنَهُ وَبَيْنَ الأَرْضِ، ثُمَّ وُضِعَ،

আবূ উসামাহ (রহ.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, হিশাম ইবনু ‘উরওয়াহ (রহ.) বলেন,আমার পিতা আমাকে বলেছেন,বি‘রে মাউনা গমনকারীরা শাহীদ হলে ‘আমর ইবনু উমাইয়াহ যামরী বন্দী হলেন। তাঁকে আমির ইবনু তুফায়ল এক নিহত ব্যক্তির লাশ দেখিয়ে জিজ্ঞেস করল,এ ব্যক্তি কে? ‘আমর ইবনু উমাইয়াহ বললেন,ইনি হচ্ছেন ‘আমির ইবনু ফুহাইরাহ। তখন সে (আমির ইবনু তুফায়ল) বলল,আমি দেখলাম,নিহত হওয়ার পর তার লাশ আকাশে উঠিয়ে নেয়া হয়েছে। এমনকি আমি তার লাশ আসমান যমীনের মাঝে দেখেছি। এরপর তা (যমীনের উপর) রেখে দেয়া হল। [সহীহ বুখারী, হাদীস নং-৪০৯৩]

সাহাবীর লাশ আকাশে উঠে যাওয়ার নাম উক্ত আহলে হাদীস ভাইয়ের কাছে কি হিসেবে পরিগণিত?

১০      

عَنْ سَعِيدِ بْنِ زَيْدِ بْنِ عَمْرِو بْنِ نُفَيْلٍ، أَنَّ أَرْوَى خَاصَمَتْهُ فِي بَعْضِ دَارِهِ، فَقَالَ: دَعُوهَا وَإِيَّاهَا، فَإِنِّي سَمِعْتُ رَسُولَ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، يَقُولُ: «مَنْ أَخَذَ شِبْرًا مِنَ الْأَرْضِ بِغَيْرِ حَقِّهِ، طُوِّقَهُ فِي سَبْعِ أَرَضِينَ يَوْمَ الْقِيَامَةِ»، اللهُمَّ، إِنْ كَانَتْ كَاذِبَةً فَأَعْمِ بَصَرَهَا، وَاجْعَلْ قَبْرَهَا فِي دَارِهَا، قَالَ: ” فَرَأَيْتُهَا عَمْيَاءَ تَلْتَمِسُ الْجُدُرَ تَقُولُ: أَصَابَتْنِي دَعْوَةُ سَعِيدِ بْنِ زَيْدٍ، فَبَيْنَمَا هِيَ تَمْشِي فِي الدَّارِ مَرَّتْ عَلَى بِئْرٍ فِي الدَّارِ، فَوَقَعَتْ فِيهَا، فَكَانَتْ قَبْرَهَا “

সাঈদ ইবনু যায়িদ ইবনু আমর ইবনু নুফায়ল (রাঃ) থেকে বর্ণিত। আরওয়া (নামক এক মহিলা) বাড়ীর কিছু অংশ নিয়ে তার সহিত বিবাদ করে। তিনি বললেন, তোমরা ওকে ছেড়ে দাও এবং জমির দাবীও ত্যাগ কর। কারণ, আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে বলতে শুনেছিঃ যে কেউ বিনা অধিকারে এক বিঘত জমি জবর দখল করবে কিয়ামতের দিন তাকে ঐ পরিমানে সাত স্তর যমীনের বেড়ি পরিয়ে দেওয়া হবে। হে আল্লাহ! যে (আরওয়া) যদি মিথ্যাবাদী হয় তবে তার চোখ অন্ধ করে দিন এবং তার ঘরেই তার কবর দাফন করুন।

রাবী বলেন, পরবর্তীকালে আমি আরওয়াকে অন্ধ অবস্থায় দেখেছি, প্রাচীর খুজে খুজে চলত। সে বলত, সাঈদ ইবনু যায়িদের বদ দুআ আমায় লেগেছে। একদিন সে বাড়ীর মধ্যে চলাচল করছিল। বাড়ীর মধ্যে এক কুয়ার কাছ দিয়ে যাওয়ার সময় সে তাতে পড়ে যায় কুয়াই তার কবর হয়। [সহীহ মুসলিম, হাদীস নং-১৬১০, ইফাবা-৩৯৮৭]

সাহাবায়ে কেরাম রাঃ থেকে কারামত সম্পর্কিত বর্ণিত মাত্র দশটি ঘটনা এখানে উদ্ধৃত করা হল। এমন অসংখ্য ঘটনা হাদীস, তারীখ ও সীরাতের কিতাবে ভরপুর রয়েছে।

সাহাবাগণের কাশফ কারামত সম্পর্কে বিশেষজ্ঞগণ কী বলেন?

সাহাবাগণ থেকে কাশফ ও কারামত সম্পর্কিত অসংখ্য ঘটনা বর্ণিত হয়েছে। দেখুন- তাফসীরে কাবীর-২১/৭৫]

ইমাম ইবনে কাসীর রহঃ ও বলেন, হাদীস ও আছারে এসব [কাশফ ও কারামত] এর ঘটনা বহু রয়েছে। [তাফসীরে ইবনে কাসীর-৬/২২৯]

ইমাম কুরতুবী রহঃ বলেন, এমন ঘটনা সাহাবী ও তাবেয়ীগণ থেকে প্রচুর পরিমাণ বর্ণিত। [তাফসীরে কুরতুবী-৫/৩৩]

এ বিষয়ে আরো জানতে পড়ুন আমাদের প্রকাশিত “ফাযায়েলে আমাল ও উলামায়ে দেওবন্দঃ আপত্তি খণ্ডন” বইটি।

ইনশাআল্লাহ এরকম অজ্ঞতাসূচক প্রশ্নাবলীর তথ্যবহুল জবাব পাবেন।

والله اعلم بالصواب
উত্তর লিখনে
লুৎফুর রহমান ফরায়েজী

পরিচালক-তালীমুল ইসলাম ইনষ্টিটিউট এন্ড রিসার্চ সেন্টার ঢাকা।

উস্তাজুল ইফতা– জামিয়া কাসিমুল উলুম সালেহপুর, আমীনবাজার ঢাকা।

ইমেইল– ahlehaqmedia2014@gmail.com

Print Friendly, PDF & Email

এটাও পড়ে দেখতে পারেন!

দুইবার বিয়ে হওয়া স্ত্রী আখেরাতে কোন স্বামীর কাছে থাকবে?

প্রশ্ন আসসালামু আলাইকুম। আপনার কাছে একটা প্রশ্ন হুজুর। আমরা দেখতে পাই যে বিভিন্ন সাহাবায়ে একরাম …