হোম / ইতিহাস ও ঐতিহ্য / রাসূল করীম (সা.)-এর জন্মতারিখঃ বিচার-বিশ্লেষণ-সংশয়-সন্দেহের অপনোদন

রাসূল করীম (সা.)-এর জন্মতারিখঃ বিচার-বিশ্লেষণ-সংশয়-সন্দেহের অপনোদন

মূল লেখক- মুফতী রেজাউল হক : শায়খুল হাদীস : দারুল উলূম যাকারিয়া দ.আফ্রিকা

অনুবাদ : মুফতী আতীকুল্লাহ

(রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের শুভ জন্ম কোন বছরে, কোন মাসে, কোন দিনে, কখন ও কোন জায়গায় হয়Ñএ নিয়ে কার কী মত? বিশুদ্ধ মতামত কোনটি? বক্ষ্যমাণ প্রবন্ধে সে বিষয়ে আলোচন-পর্যালোচনা করা হয়েছে।)

মুহাক্কিক ও গবেষকদের মতে, ৯ ই রবিউল আউয়াল মোতাবেক ২০ শে এপ্রিল ৫৭১ খ্রিস্টাব্দ, রোজ সোমবার আনুমানিক ভোর ৪টা ৪০ মিনিটে রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর শুভাগমনে পৃথিবী চির ধন্য হয়।

জন্মের বছর :

রাসূল করীম (সা.)-এর শুভাগমন হয় ‘আমুল ফিল’-এ তথা অভিশপ্ত আবরাহা তার বিশাল হাতি বাহিনী নিয়ে কা’বা শরীফের ওপর যে বছর আক্রমণ করে, সেই বছরে রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) শুভ জন্মলাভ করেন।

এই বিষয়ে সকল ঐতিহাসিক ও সীরাত প্রণেতাগণ ঐক্যমত্য পোষণ করেছেন। (আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ২/৩২১, ছিফাতুস সাফওয়াহ-১/৫১, আর-রাওযুল আনফ ১/২৭৬)

হাতি বাহিনীর অভিযানের কয় দিন পর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর অবির্ভাব ঘটে তা নিয়ে অবশ্য বিভিন্ন মতামত পাওয়া যায়, তবে যে মতটি সর্বাধিক প্রচলিত ও অধিক প্রসিদ্ধ তা হলো, পঞ্চাশ দিন পরে রাসূল (সা.) জন্মলাভ করেন।

হাফেয ইবনে কাসীর (রহ.) বলেন,

ولد عام الفيل…. فقيل بعده بشهر… وقيل بخمسين يوما، وهو أشهر

 “জন্ম লাভ করেন ‘আমুল ফিল’-এ। কেউ কেউ বলেন, ঘটনার এক মাস পরে; আর কেউ কেউ বলেন, পঞ্চাশ দিন পরে, আর এই মতটিই অধিক প্রসিদ্ধ।” (আল-বিদায় : ২/৩২১)

জন্ম মাস :

কোন মাসে জন্ম লাভ করেন? এ বিষয়ে বহু মতপার্থক্য রয়েছে।

আল্লামা কাসতলানী (রহ.) (মৃ. ৯২৩ হি.) ছয়টি মত উল্লেখ করেছেন। যথাÑ

১. মুহাররম,

২. ছফর,

৩. রবিউল আউয়াল,

৪. রবিউল আখের,

৫. রজব,

৬. রমাজান।

তবে জমহুর (সংখ্যাগুরু ঐতিহাসিকগণ) এ বিষয়ে ঐকমত্য পোষণ করেছেন যে রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর জন্মগ্রহণ রবিউল আউয়াল মাসে হয়েছে।

হাফেজ ইবনে কাছীর (রহ.) বলেন,

ثم الجمهور على أنه كان فى شهر ربيع الأول

 “অতঃপর জমহুর একমত হয়েছেন রবিউল আউয়াল মাসের ওপর।” (আল-বিদায়া ২/৩২০)

বিশ্বনন্দিত প্রসিদ্ধ আলেমে দ্বীন আল্লাম মুহাম্মদ যাহেদ কাউসারী (রহ.) বলেন, রবিউল আউয়াল ব্যতীত অন্য মাসে জন্ম লাভ করার মতামতটি বিজ্ঞ ওলামায়ে কেরামের নিকট গ্রহণযোগ্য নয়, তা ভুলক্রমে কারো কলমে চলে এসেছে হয়তো। (মাকালাতে কাউছারী, পৃ. ৪০৫)

জন্মদিন :

কোন দিনটিতে জন্ম লাভ করেন? এ কথাই সকল ঐতিহাসিক একমত যে রাসূল (সা.)-এর জন্ম সোমবার হয়েছে।

فى الحديث: وسئل رسول الله صلى الله عليه وسلم عن يوم الإثنين، فقال ذلك يوم ولدت فيه ويوم يبعث

 ‘‘হাদীসে বর্ণিত আছে যে রাসূল (সা.)-কে সোমবার-বিষয়ক প্রশ্ন করা হলো। রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) উত্তরে বললেন, সেটি এমন দিন, যাতে আমার জন্ম হয়েছে এবং প্রেরিত হয়েছি। (মুসলিম শরীফ, হা. ১১৬২; আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ২/৩১৯)

জন্মতারিখ :

রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) মাহে রবিউল আউয়ালের সোমবারে জন্ম লাভ করেছেন এ কথা স্পষ্ট ও চিহ্নিত, তবে কোন তারিখে হয়েছে, তা নির্দিষ্ট ও চিহ্নিত করা সম্ভব হয়নি।

পক্ষান্তরে অধিকাংশ ওলামায়ে কেরাম বলেন, নির্দিষ্ট তারিখ রয়েছে। কিন্তু নির্দিষ্ট কোন তারিখে জন্মগ্রহণ করেছেন, তা নিয়ে ইখতিলাফ রয়েছে ও বিভিন্ন রেওয়ায়ত রয়েছে।

আল্লামা কসতলানী (রহ.) মোট সাতটি রেওয়ায়াত উল্লেখ করেছেন। যথাÑ

১.

২ রবিউল আউয়াল।

২.

৮ রবিউল আউয়াল।

৩.

১০ রবিউল আউয়াল।

৪.

১২ রবিউল আউয়াল।

৫.

১৭ রবিউল আউয়াল।

৬.

১৮ রবিউল আউয়াল।

৭.

২২ রবিউল আউয়াল। (আল- মাওয়াহিবুল লাদুননিয়্যাহ ১/১৪০-১৪২)

আল্লামা যাহেদ কাউছারী (রহ.) বলেন, ৮, ৯ ও ১০Ñএই তিন মতামত ব্যতীত অন্যান্য মতামত গ্রহণযোগ্য নয়।

সুতরাং আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হলো এই তিনটি রেওয়ায়াত। এখন প্রশ্ন হল, এ তিনটির কোনটি প্রাধান্য পাওয়ার যোগ্য এবং কেন?

১০ তারিখের রেওয়ায়াত :

এ রেওয়ায়াতকে ইবেন সা’আদ (রহ.) (মৃ. ২৩০ হি.) মুহাম্মদ বাকের (রহ.) (মৃ. ১১৪)-এর দিকে নিসবত করেন।

কিন্তু এ সনদে তিন বর্ণনাকারী এমন রয়েছেন যাঁরা বিতর্কিত, যাঁদের বিষয়ে কালাম রয়েছে।

সুতরাং ১০ তারিখের রেওয়ায়াতটি প্রাধান্য পাওয়ার যোগ্য নয়।

আর এ রেওয়ায়াতটির দিকে আল্লামা কাউছারী ( রহ.) ইঙ্গিত করেছেন। এ রেওয়ায়াত নকল করা হয় তবকাতে কুবরা থেকে। রেওয়ায়াতটি হলো,

قال ابن سعد: أخبرنا محمد بن عمر بن واقد الأسلمى قال: حدثنى أبو بكر ابن عبد الله بن ابى سبرة عن إسحاق بن عبد الله بن أبى فروة عن أبى جعفر محمد بن على (يعرف بمحمد الباقر) قال: ولد رسول الله صلى الله عليه وسلم يوم الإثنين لعشر ليال خلون من شهر ربيع الأول، …. فبين الفيل وبين مولد رسول الله صلى الله عليه وسلم خمس وخمسين ليلة

অনুবাদ : আবু জাফর মুহাম্মদ ইবনে আলী যিনি মুহাম্মদ আল বাকের নামে প্রসিদ্ধ। তিনি বলেন, রাসূলে কারীম (সা.)-এর জন্ম হয়েছে ১০ রবিউল আউয়াল। …হাতি বাহিনীর অভিযান ও রাসূল (সা.)-এর পবিত্র জন্মের মধ্যকার সময়ের ব্যবধান ৫৫ দিন। (আত-তাবকাতুল কুবরা, ১/১০০)

‘১২ রবিউল আউয়াল’-এর রেওয়ায়াত :

এ রেওয়ায়াতের বর্ণনাকারী হলেন মুহাম্মদ ইবনে ইসহাক (মৃ. ১৫১ হি.) কিন্তু তিনি কোনো সনদ বর্ণনা করেননি।

এ বর্ণনাটি যদিওবা অধিক প্রসিদ্ধ ও সর্বাধিক প্রচলিত এবং মক্কাবাসী সেই অনেক আগে থেকেই এ দিনেই সিরাত সেমিনার করে থাকেন সাথে সাথে পৃথিবীব্যাপী সভা-সেমিনার এই দিনেই হয়ে আসছে এতদ্বসত্ত্বেও এ রেওয়ায়াতটি প্রমাণসিদ্ধ নয় এবং এই দিনেই যে রাসূল (সা.)-এর জন্ম হয়েছে, তার কোনো দলিল-প্রমাণ পাওয়া যায় না।

একটি রেওয়ায়াত পাওয়া গেলেও সেটি মুত্তাসিল না হওয়াতে অগ্রহণযোগ্য বরং তা সনদহীন রেওয়ায়াতের ন্যায়। রেওয়ায়াতটি নিম্নে প্রদত্ত হলো

حَدَّثَنَا أَبُو الْحَسَنِ مُحَمَّدُ بْنُ أَحْمَدَ بْنِ شَبُّوَيْهِ الرَّئِيسُ بِمَرْوَ، ثنا جَعْفَرُ بْنُ مُحَمَّدٍ النَّيْسَابُورِيُّ، ثنا عَلِيُّ بْنُ مِهْرَانَ، ثنا سَلَمَةُ بْنُ الْفَضْلِ، عَنْ مُحَمَّدِ بْنِ إِسْحَاقَ، قَالَ: «وُلِدَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ لِاثْنَتَيْ عَشْرَةَ لَيْلَةً مَضَتْ مِنْ شَهْرِ رَبِيعٍ الْأَوَّلِ

মুহাম্মদ ইবেন ইসহাক থেকে বর্ণিত “রাসূল (সা.) জন্মগ্রহণ করেন রবিউল আউয়াল মাসের ১২ তারিখে।” (মুসতাদরাকে হাকেম, হা. ৪১৮৩)

৯ তারিখে জন্মগ্রহণ নিয়ে বিশ্লেষণ :

সূত্র ও যুক্তির বিচারে যে মতটি প্রাধান পাওয়ার যোগ্য তা হলো, রাসূল (সা.)-এর জন্ম রবিউল আউয়াল মাসের আট দিন পর নবম তারিখে।

বর্ণনাসমূহ :

১.

আল্লামা ইবনে আব্দিল বার (রহ.) (মৃ. ৪৬৩ হি.)

এ বিষয়ে মতানৈক্য বর্ণনা করতে গিয়ে উপরোক্ত মতটি সর্বাগ্রে উল্লেখ করেছেন। [আল ইস্তি’আব ইবনে আব্দিল বার (রহ.), ১/৩০]

قال أبو عمر: وقد قيل لثمان وخلون منه وقيل..، قيل… وقيل..

২.

হাফেয ইবনে কাসীর (রহ.) বলেন,

وَقِيلَ لِثَمَانٍ خَلَوْنَ مِنْهُ حَكَاهُ الْحُمَيْدِيُّ عَنِ ابْنِ حَزْمٍ.

وَرَوَاهُ مَالِكٌ وَعُقَيْلٌ وَيُونُسُ بْنُ يَزِيدَ وَغَيْرُهُمْ عَنِ الزُّهْرِيِّ عَنْ مُحَمَّدِ بْنِ جُبَيْرِ بْنِ مُطْعِمٍ وَنَقَلَ ابْنُ عَبْدِ الْبَرِّ عَنْ أَصْحَابِ التَّارِيخِ أَنَّهُمْ صَحَّحُوهُ وَقَطَعَ بِهِ الْحَافِظُ الْكَبِيرُ مُحَمَّدُ بْنُ مُوسَى الْخُوَارِزْمِيُّ وَرَجَّحَهُ الحافظ أبو الخطاب بن دِحْيَةَ فِي كِتَابِهِ التَّنْوِيرِ فِي مَوْلِدِ الْبَشِيرِ النَّذِيرِ

 “কেউ কেউ বলেন, রাসূল (সা.)-এর জন্ম মাসের আট দিন অতিবাহিত হওয়ার পর নবম দিনে হয়েছে।

হুমায়দি (রহ.) ইবনে হাযম থেকে বর্ণনা করেন, মালেক, উকাইল, ইউনুস বিন ইয়াযিদ প্রমুখ ইমাম যোহরী (রহ.) থেকে বর্ণনা করেন, তিনি মুহাম্মদ ইবনে জুবাইর ইবনে মুতঈম (রহ.) থেকে বর্ণনা করেন।

ইবনে আব্দিল বার (রহ.) বলেন, ইতিহাসবিদরা উপরোক্ত মতের সত্যায়ন করেছেন।

হাফেযে কবীর মুহাম্মদ ইবনে মুসা আল-খারযেমী (রহ.) তাঁকে আরো সুনিশ্চিত ও মাযবুত করেছেন এবং হাফেয আবুল খাত্তাব ইবনে দিহয়া নিজ গ্রন্থে এ রেওয়ায়াতকে প্রাধান্য দিয়েছেন।” (আল-বিদায়া আন-নিহায়া ২/৩২০)

৩.

হযরত মাওলানা হিফজুর রহমান (রহ.) (মৃ. ১৩৮২ হি.) লিখেছেন,

সাধারণ জনগণের মধ্যে ১২ রবিউল আউয়ালের মতটি অধিক প্রচার-প্রসার হয়, যার ভিত্তি দুর্বল রেওয়ায়াতের ওপর। আর কিছুসংখ্যক উলামায়ে কেরামের মত হলো, ৮ রবিউল আউয়াল, তবে বিশুদ্ধ ও প্রমাণসিদ্ধ মতটি হচ্ছে ৯ রবিউল আউয়াল।

বিশ্ব্যবিখ্যাত জীবনীকার, ইতিহাস রচয়িতা ও আইম্মায়ে হাদীসসহ অনেকেই এ তারিখকে সহীহ ও মজবুত বলেছেন।

তাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন হুমাইদী (রহ.), উকাইল (রহ.), ইউনুস ইবনে ইয়াযিদ (রহ.), ইবনে হাযম (রহ.), মুহাম্মদ ইবনে মুসা খারযেমী (রহ.), আবুল খাত্তাব ইবনে দিহয়া (রহ.), ইবনে তাইমিয়া (রহ.), ইবনুল কাইয়ূম (রহ.), ইবনে কাসীর (রহ.), ইবনে হাজর আসকালানী (রহ.) ও শায়খ বদরুদ্দীন আইনী (রহ.)। (কাসাসুল কোরআন ৪/২৫৩)

৪.

আল্লামা সুলাইমান নদভী (রহ.) ও ৯ রবিউল আউয়ালকে রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর জন্মতারিখ হওয়ার মতকে প্রাধান্য দিয়েছেন। (রাহমাতুল লিল আলামীন, ১/৩৮-৩৯)

যুক্তির বিচারে ৯ রবিউল আউয়াল

১.

মুহাম্মদ ইবনে মুসা খারযেমী (রহ.) (মৃ. ২৩৫ হি.) ছিলেন সৌরবিজ্ঞানী। তাঁর মতের কথা আগেই বলা হয়েছে।

২.

সৌরবিজ্ঞানী মাহমুদ পাশা মিশরী (১৩০২ হি.) ফ্রান্সিস ভাষায় تقويم العرب قبل الإسلام (ইসলামপূর্ব আরবরে ক্যালেন্ডার) এ বিষয়ে অসাধারণ এক গ্রন্থ রচনা করেন। আরবীতে অনুবাদ করেন, আল্লামা আহমদ যকী পাশা (মৃ. ১৩৫৩ হি.) যার নাম হলো,

نتائج الإفهام فى تقويم القرب قبل الإسلام وفى تحقيق مولد النبى وعمره عليه الصلاة والسلام

এই কিতাবটিতে বহু বৈজ্ঞানিকের উদ্ধৃতিকে সামনে রেখে করা গবেষণা ও বিশ্লেষণে ৯ রবিউল আউয়াল তারিখটি স্পষ্ট হয়ে উঠে। ( নাতায়িজুল আফহাম…, পৃ. ৩৫-৩৮)

উপরোক্ত কিতাবে উল্লেখ করা বিশ্লেষণসমূহ থেকে একটি বিশ্লেষণ নিম্নে প্রদত্ত হলোঃ

রাসূল (সা.)-এর পবিত্র যুগে দশম হিজরীর মাহে শাওয়ালের শেষ তারিখে সূর্যগ্রহণ হয়েছিল।

একই দিনেই রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সাহেবজাদা হযরত ইবরাহীম (রা.) মৃত্যুবরণ করেন,

يَوْم مَاتَ إِبْرَاهِيم يَعْنِي بن النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَقَدْ ذَكَرَ جُمْهُورُ أَهْلِ السِّيَرِ أَنَّهُ مَاتَ فِي السَّنَةِ الْعَاشِرَةِ مِنَ الْهِجْرَةِ …… وَالْأَكْثَرُ عَلَى أَنَّهَا وَقَعَتْ فِي عَاشِرِ الشَّهْرِ

হাফেয ইবনে হাজর আসকালানী (রহ.) (মৃ. ৮৫২ হি.) বলেন, যেদিন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর প্রিয় ছেলে ইবরাহীম (রা.) মৃত্যুবরণ করেন (সেদিনই সূর্যগ্রহণের ঘটনা ঘটে)।

অধিকাংশ সীরাত প্রণেতাগণ বলেন, তিনি মারা যান দশম হিজরিতে। কোন মাসে এ ঘটনা সংঘটিত হয় সে বিষয়ে মতানৈক্য থাকলেও সংখ্যাগুরু উলামায়ে কেরামের মতামত হচ্ছে দশম মাস তথা শাওয়াল মাসে সূর্যগ্রহণের ঘটনাটি ঘটেছিল। (ফাতহুল বারী, ৩/৪৮৯)

উপরোক্ত হিসাব অনুযায়ী গণনা করা হলে রাসূল (সা.)-এর জন্মগ্রহণ রবিউল আউয়ালের ৯ তারিখে হওয়াটাই প্রমাণিত হয়।

কেননা, জন্মের দিনটি যে সোমবার এ বিষয়ে তো সাবাই একমত আর সেদিনটি হস্তি বাহিনী ধ্বংসের বছরের রবিউল আউয়ালের ৯ তারিখেই হয়।

এ ছাড়া অন্য তারিখে হওয়ার কোনো সম্ভাবনাই নেই।

আল্লামা মাহমুদ পাশা বলেন, “সমস্ত উলামায়ে কেরাম ঐকমত্য পোষণ করেন যে রাসূল (সা.)-এর শুভ জন্মের শুভ দিনটি ছিল সোমবার। (আবরাহার হাতি বাহিনীর অভিযানের বছরের) রবিউল আউয়াল মাসের ৮ কিংবা ১২তম তারিখে সোমবার পাওয়া যায় না। সে মাসের নবম দিনে সোমবার ছিল।

সুতরাং নবম দিন ভিন্ন অন্য কোনো তারিখে রাসূল (সা.)-এর জন্ম হয়েছেÑএ কথা অগ্রহণযোগ্য বলেই সাব্যস্ত হবে।”

হযরত মাওলানা হিফজুর রহমান (রহ.) বলেন, মাহমুদ পাশা (কুসতুনতুনিয়ার প্রসিদ্ধ জ্যোতির্বিজ্ঞানী ও সৌরবিজ্ঞানী ছিলেন) তিনি জ্যোতির্বিদ্যার আলোকে যে নক্ষত্রসূচি/বর্ষপুঞ্জি প্রণয়ন করেছেন, যার উদ্দেশ্য ছিল রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর যুগ থেকে এ যুগ পর্যন্ত সূর্যগ্রহণ ও চন্দ্রগ্রহণের যত ঘটনা ঘটে গিয়েছে তার একটা সঠিক হিসাব বের করা।

তিনি তাতে পূর্ণ তাহকীকের সাথে প্রমাণ করেছেন যে রাসূল (সা.)-এর মোবারক জন্মের বছরে কোনোভাবেই সোমবার ১২ রবিউল আউয়ালে পড়ে না বরং তা একমাত্র ৯ রবিউল আউয়ালেই পড়ে।

শক্তিশালী দলিল-প্রমাণের ভিত্তিতে, বিশুদ্ধ সূত্র ও বর্ণনার নিরিখে, জ্যোতির্বিদ্যা ও সৌরবিজ্ঞানের আলোকে রাসূল  (সা.)-এর জন্মগ্রহণের গ্রহণযোগ্য প্রামাণ্য তারিখ হলো ৯ রবিউল আউয়াল। (কাসাসুল কোরআন ৪/২৫৩)

৩.

উপরোক্ত নাতায়েজু আফহাম… নামক গ্রন্থের এক অ্যাডিশনে ভূমিকা লিখেছেন সে যুগের প্রসিদ্ধ ইসলামিক চিন্তাবিদ, ইতিহাসবিদ ও বিখ্যাত সাহিত্যিক শায়খ আলি তানতাবী (রহ.) (মৃ. ১৪২০ হি.)।

তিনি নিজের লিখিত ভূমিকায় গ্রন্থ প্রণেতা কর্তৃক গৃহীত প্রাধান্য পাওয়া ৯ তারিখের মতের পক্ষে জোরদার সমর্থন জুগিয়েছেন। (মুকাদ্দামাতুত তানতাবী, ৮৩)

৪.

স্বনামধন্য মুহাদ্দিস ও গবেষক শায়খ আহমদ শাকের (রহ.) (আহমদ বিন মুহাম্মদ আব্দুল কাদের, মৃ. ১৩৭৭ হি.) তিনিও শায়খ বৈজ্ঞানিক মাহমুদ পাশার গবেষণা মেনে নিয়েছন এবং সে গবেষণা থেকে সূর্যগ্রহণ-বিষয়ক সহযোগিতা নিয়েছেন। (হাশিয়াতুশ শায়খ আহমদ শাকের ‘আলাল মুহাল্লা বিল আছার, ৫/১১৪-১১৫)

৫.

আরবের গবেষক সৌরবিজ্ঞানী আব্দুল্লাহ ইবনে মুহাম্মদ ইবনে ইবরাহীম (মৃ. ১৪১৬ হি.) লিখেছেন, “বিশুদ্ধ রেওয়ায়াত দ্বারা প্রমাণিত হয় যে রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) শুভাগমন হয় ২০ এপ্রিল ৫৭১ ইংরেজিতে আমুল ফিল’-এ…সুতরাং তাঁর জন্ম-মৃত্যুর দিন খুব সূক্ষ্মভাবে বের করা সম্ভব…এর ভিত্তিতে বর্ণনার বিচারে ও যুক্তির আলোকে রাসূল (সা.)-এর জন্মতারিখ হলো ৯ রবিউল আউয়াল হিজরীপূর্ব ৫৩ সনে মোতাবেক ২০ এপ্রিল, ৫৭১ খ্রিস্টাব্দ। (তাকভীমুল আযমান, পৃ. ১৪৩)

আরো দ্রষ্টব্য

গবেষণা প্রবন্ধ যার শিরোনাম হলো

تحديد ميلاده الشريف

যা সন্নিবেশিত রয়েছে

ما شاع ولم يثبت فى السيرة النبوية নামক গ্রন্থে, লেখক হলেন মুহাম্মদ ইবেন আবদুল্লাহ। সে প্রবন্ধে প্রবন্ধকার বৈজ্ঞানিক আবদুল্লাহ ইবনে ইবরাহীমের উপরোক্ত উদ্ধৃতি উল্লেখপূর্বক অন্যান্য উলামায়ে কেরামের মতামতের আলোকে ৯ তারিখের মতকে প্রাধান্য দিয়েছেন।

অনুরূপ আল্লামা যাহেদ কাউসারী (রহ.) নিজের রচিত প্রবন্ধ

المولد الشريف النبوى

-এ মাহমুদ পাশার উচ্চ প্রশংসা করেছেন এবং প্রবন্ধ রচনায় তাঁর রচিত কিতাব থেকে যথেষ্ট সহযোগিতা নিয়েছেন এবং তাঁর সাথে সহমতপোষণ করেছেন। (মাকালাতে কাউসারী, পৃ. ৪০৫-৪০৮)

আরো দ্রষ্টব্য হযরত মাওলানা মুফতী ্ওমর ফারুক সাহেব (শায়খুল হাদীস দারুল উলূম লন্ডন) কর্তৃক রচিত প্রবন্ধ, যা তাঁ র প্রণীত কিতাব ফেকহী জাওয়াহের-এ সন্নিবেশিত, ১/৬৮-৭১ ৮ ও ৯ তারিখের বর্ণনাদ্বয়ের মধ্যে সমন্বয় সাধন মনে রাখতে হবে, কিছু কিছু উলামা হযরাত ৮ তারিখের মতটি গ্রহণ করেছেন এবং কিছু কিছু ক্ষেত্রে ৮ ও ৯ উভয়ের মধ্যে একটিকে অপরটির ওপর প্রাধান্য দেওয়ারও চেষ্টা করা হয়েছে।

মাওলানা হিফজুর রহমান সাহেব (রহ.) মতদ্বয়ের মধ্যে সমন্বয় সাধন করেছেন। তিনি বলেন, ৮ ও ৯ এর মধ্যে বাস্তবিকার্থে কোনো এখতিলাফ নেই।

কেননা তা মাসের ২৯ ও ৩০ এর হিসাবের ওপর নির্ভরশীল। হিসাব করে দেখা যায়, সঠিক তারিখটি ছিল মূলত ২১ এপ্রিল। এ হিসেবে ৮ তারিখের সকল বর্ণনা ৯ তারিখের জন্য সহায়ক হয়ে যায়। (কাসাসুল কোরআন, ৪/২৫৪)

জন্মের সময়কাল :

সোমবারের কোন সময়ে রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) জন্মগ্রহণ করেন? সীরাতের কিতাবসমূহে স্পষ্টভাবে উল্লেখ রয়েছে যে নবী কারীম (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর জন্ম সুবহে সাদিকের সময় হয়েছে আর পবিত্র মক্কা নগরীতে ২০ এপ্রিল সুবহে সাদিক হয় ৪টা ৩৯ মিনিটে।

সুতরাং বলা যায় রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) ৯ রবিউল আউয়াল, হিজরীপূর্ব ৫৩ সনে; ২০ এপ্রিল, ৫৭১ খ্রিস্টাব্দ, রোজ সোমবার আনুমানিক ভোর ৪টা ৪০ মিনিটে এ ধরাতে তাশরীফ এনেছেন।

উপরোক্ত আলোচনা-পর্যালোচনা থেকে এ কথা স্পষ্ট হয়ে যায় যে আকল ও নকলের আলোকে, যুক্তি ও সূত্রের বিচারে রাসূল (সা.)-এর মোবারক জন্মের গ্রহণযোগ্য তারিখ হলো, ৯ রবিউল আউয়াল।

জন্মস্থান :

জমহুর উলামায়ে কেরাম বলেন, রাসূল (সা.) পবিত্র জন্মস্থান হলো পবিত্র মক্কা নগরী। তবে নির্দিষ্ট কোন জায়গায় জন্মলাভ করেন তা নিয়ে মতভেদ থাকলেও প্রসিদ্ধ মত হচ্ছে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর জন্ম শা’বে বনি হাশেম নামক প্রসিদ্ধ জায়গায় হয়েছে। কয়েক বছর পূর্বেও মানুষ সে জায়গার জিয়ারতের উদ্দেশ্যে যেতেন। বর্তমানে সে জায়গা বন্ধ করে দিয়ে তাতে মাকতাবা নির্মাণ করা হয়েছে।

Print Friendly, PDF & Email

এটাও পড়ে দেখতে পারেন!

মাসিকের সময় সহবাস না করলে সন্তান হয় না?

প্রশ্ন অনেক মুরুব্বী মহিলারা বলে থাকে যে,হায়েজ অবস্থায় স্ত্রী না করলে নাকি সন্তান জন্ম হয় …