হোম / আহলে হাদীস / শাফেয়ী মাযহাবে রফউল ইয়াদাইন আছে তো আমাদের মানতে সমস্যা কোথায়?

শাফেয়ী মাযহাবে রফউল ইয়াদাইন আছে তো আমাদের মানতে সমস্যা কোথায়?

প্রশ্ন

০১

আবদুল্লাহ ইবনু মাসলামা (রঃ)— সালিম ইবনু আবদুল্লাহ (রাঃ) তাঁর পিতা থেকে বর্ণিত যে, নাবী (সাঃ) যখন সালাত শুরু করতেন, তখন উভয়হাত তাঁর কাঁধ বরাবর উঠাতেন। আর রুকু’তে যাওয়ার জন্য তাকবীর বলতেন এবং যখন রুকু থেকে মাথা উঠাতেন তখনও অনুরূপভাবে দু’হাত উঠাতেন এবং সামিআল্লাহু লিমান হামিদা ও রাব্বানা অলাকাল হামদ্‌ বলতেন। কিন্তু সিজদার সময় এরূপ করতেন না। সহীহ বুখারী, ২য় খণ্ড, হাদিস নং ৬৯৯

২।

মুহাম্মদ ইবনু মুকাতিল(রঃ)—আবদুল্লাহ ইবনু উমর (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাসুলুল্লাহ (সাঃ)কে দেখেছি, তিনি যখন সালাতের জন্য দাঁড়াতেন তখন উভয়হাত কাঁধ বরাবর উঠাতেন। এবং যখন তিনি রুকুর জন্য তাকবীর বলতেন তখনও এরূপ করতেন। আবার যখন রুকু হতে মাথা উঠাতেন তখনও এরূপ করতেন এবং সামিআল্লাহু লিমান হামিদা বলতেন। তবে সিজদার সময় এরূপ করতেন না। সহীহ বুখারী, ২য় খণ্ড, হাদিস নং ৭০০

০৩

ইসহাক ওয়াসিতি(রঃ)—আবু কিলাবা(রঃ)হতে বর্ণিত, তিনি মালিক ইবনু হুওয়ায়রিশ(রাঃ)কে দেখেছেন তিনি যখন সালাত আদায় করতেন তখন তাকবীর বলতেন এবং তাঁর দু’হাত উঠাতেন। আর রুকু করার ইচ্ছা করতেন তখনও তাঁর উভয়হাত উঠাতেন। আবার, যখন রুকু থেকে মাথা উঠাতেন তখনও তাঁর উভয়হাত উঠাতেন এবং তিনি বর্ণনা করেন যে, রাসুলুল্লাহ (সাঃ) এরূপ করেছেন। সহীহ বুখারী, ২য় খণ্ড, হাদিস নং ৭০১,

এই রকম রফে ইয়াদাইনের পক্ষে বহু হাদীস রয়েছে। এই হাদীসগুলো কি মানা যাবে ?

তাছাড়া ইমাম শাফেয়ী (র) নামায তো এই রমকই তাহলে ইমাম শাফেয়ী (র) অনুসরণ করলে ঐ হাদীসকেই মানা হয়। তিনি তো চার ইমামের মধ্যে একজন।

আপনাকে ধন্যবাদ জানাচ্ছি-

আগেকার প্রশ্নের উত্তর দাওয়ার জন্য।

আশা করছি খুব শিগগিরই উত্তরটি পাবো ইনশা আল্লাহ।

উত্তর

بسم الله الرحمن الرحيم

আপনি সালাতে রফউল ইয়াদাইন করা সংক্রান্ত তিনটি দলীল পেশ করেছেন। আমরাও আপনাকে রফউল ইয়াদাইন তরক করার উপর তিনটি দলীল পেশ করছিঃ


عن عبد الله قال ألا أخبركم بصلاة رسول الله صلى الله عليه وسلم قال فقام فرفع يديه أول مرة ثم لم يعد

হযরত আব্দুল্লাহ বিন মাসউদ রাঃ থেকে বর্ণিত। তিনি বলেনঃ আমি কি রাসূল সাঃ এর নামায সম্পর্কে তোমাদের জানাবো? তারপর তিনি দাঁড়ালেন তারপর দুই হাত উঠালেন প্রথম বার। তারপর আর হাত উঠালেন না। {সুনানে নাসায়ী-১/১৫৮,হাদীস নং-১০২৫}

গায়রে মুকাল্লিদ আলেম শায়েখ নাসীরুদ্দীন আলবানী সাহেবও স্বীকার করেছেন যে,এ হাদীস দোষণীয় হবার কোন কারণ নেই। বরং তিনি স্পষ্ট ভাষায় একে সহীহ হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন {সহীহ ওয়া জঈফ সুনানে নাসায়ী, হাদীস নং-১০২৬, হাশিয়ায়ে মিশকাত}


1572 – 
حَدَّثَنَا عَبْدُ اللَّهِ بْنُ أَيُّوبَ الْمُخَرِّمِيُّ، وَسَعْدَانُ بْنُ نَصْرٍ، وَشُعَيْبُ بْنُ عَمْرٍو فِي آخَرِينَ قَالُوا: ثَنَا سُفْيَانُ بْنُ عُيَيْنَةَ، عَنِ الزُّهْرِيِّ، عَنْ سَالِمٍ، عَنْ أَبِيهِ قَالَ: «رَأَيْتُ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ إِذَا افْتَتَحَ الصَّلَاةَ رَفَعَ يَدَيْهِ حَتَّى يُحَاذِيَ بِهِمَا» وَقَالَ بَعْضُهُمْ: حَذْوَ مَنْكِبَيْهِ، وَإِذَا أَرَادَ أَنْ يَرْكَعَ وَبَعْدَ مَا يَرْفَعُ رَأْسَهُ مِنَ الرُّكُوعِ لَا يَرْفَعُهُمَا، وَقَالَ بَعْضُهُمْ: وَلَا يَرْفَعُ بَيْنَ السَّجْدَتَيْنِ، وَالْمَعْنَى وَاحِدٌ

হযরত সালেম স্বীয় পিতা ইবনে উমর রাঃ থেকে বর্ণনা করেন যে,তিনি বলেন যে,আমি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে দেখেছি,তিনি নামায যখন শুরু করতেন তখন রফউল ইয়াদাইন করতেন কাঁধ বরাবর। আর যখন রুকু করতে ইচ্ছে করতেন এবং রুকু থেকে মাথা উঠাতেন,তখন তিনি রফউল ইয়াদাইন করতেন না। কতিপয় বর্ণনাকারীগণ বর্ণনা করেন যে,দুই সেজদার মাঝেও রফউল ইয়াদাইন করতেন না। অর্থ একই। [মুসনাদে আবী আওয়ানা-১/৪২৩,হাদীস নং-১৫৭২,তাহকীক-আইমান বিন আরেফ আদদিমাশকী,প্রকাশক-দারুল মা’রিফা,বাইরুত,লেবানন]

হাদীসটি সহীহ।

আসওয়াদ রহ. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন-
আমি হযরত ওমর রা.-কে দেখেছি, তিনি শুধু প্রথম তাকবীরের সময় রাফয়ে ইয়াদাইন করতেন,পরে করতেন না।’ (তাহাবী: ১/১৬৪)

আল্লামা যায়লায়ী রহ. এই হাদীসকে সহীহ বলেছেন। সহীহ বুখারীর বিখ্যাত ভাষ্যকার আল্লামা ইবনে হাজর আসকালানী রহ. এই বর্ণনার সকল রাবীকে ছিকাহ (নির্ভরযোগ্য) বলেছেন। আলজাওহারুন নাকী গ্রন্থে বলা হয়েছে এই হাদীসের সনদ সহীহ মুসলিমের সনদের মতো শক্তিশালী।

ইমাম তাহাবী রহ. বলেন, হযরত ওমর রা. এর আমল এবং এ বিষয়ে সাহাবায়ে কেরাম রা.-এর কোনরূপ বিরোধিতা না থাকায় প্রমাণ করে যে, এটি সঠিক পদ্ধতি এবং এ পদ্ধতির বিরোধিতা করা কারও জন্য উচিত নয়।’
(তাহাবী : ১/১৬৪)

এছাড়াও রফউল ইয়াদাইন না করা সম্পর্কিত অনেক সহীহ হাদীস রয়েছে। যা আমাদের সাইটে প্রকাশিত অন্যান্য লিখায় দেয়া আছে। সেগুলো দেখে নিতে পারেন।

রফউল ইয়াদাইন বিষয়ে আরো জানতে হলে ক্লিক করুন

আপনি যেমন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের রফউল ইয়াদাইন করা নির্ভর দু’টি হাদীস এবং একজন সাহাবীর আমল নির্ভর একটি হাদীস পেশ করেছেন। আমরাও রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নামাযে রফউল ইয়াদাইন না করার আমল নির্ভর দু’টি হাদীস এবং হযরত উমর রাঃ এর সালাতে রফউল ইয়াদাইন না করা নির্ভর একটি হাদীস পেশ করেছি।

আপনার উদ্ধৃত হাদীসগুলো যেমন সহীহ। আমাদের উদ্ধৃত করা হাদীসগুলোও সহীহ।

এখন আমাদের প্রশ্ন হল,এ উপমহাদেশে ইসলাম আসার পর থেকে নামাযে রফউল ইয়াদাইন না করার যে আমলটি জারী আছে। সেটি সহীহ হাদীস নির্ভর হবার পরও তা ছেড়ে দিয়ে ভিন্ন হাদীসের উপর আমল শুরু করে সাধারণ মানুষকে কেন নামায বিষয়ে সংশয় ফেলে দিবেন?

হঠাৎ করে নতুন পদ্ধতিতে নামায পড়তে শুরু করলে সাধারণ মানুষ কি নামায নিয়েই সংশয়ে পতিত হবে না? তাদের মনে কি এ প্রশ্ন আসবে না যে, বুঝি নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নামাযের তরীকা সংরক্ষিত নয়। তাই একেক জন একেক পদ্ধতিতে আমল করছে।

অশিক্ষিত ও সাধারণ মানুষ যেন এমন বিভ্রান্তিতে পতিত না হয়,এ কারণেই আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে এরকম বিপরীতমুখী হাদীসের বিষয়ে মূলনীতি শিক্ষা দিয়েছেনঃ

وَأُولِي الْأَمْرِ مِنكُمْ ۖ [٤:٥٩

এবং তোমাদের মধ্যে যারা উলুল আমর তথা মুজতাহিদ তাদের আনুগত্ব কর। [সূরা নিসা-৫৯]

এখানে দেখুন, পরিস্কার বলা হচ্ছে, তোমাদের মাঝের যিনি উলুল আমর মুজতাহিদ হবেন তার ইজতিহাদকৃত বিষয়টি মানতে। অন্য এলাকারটা মানার নির্দেশ কিন্তু দেয়া হয়নি।

তো রফউল ইয়াদাইন সংক্রান্ত বিপরীতমুখী হাদীস থাকায়। আমরা কুরআনের নির্দেশ মতে আমাদের এলাকার মুজতাহিদের সিদ্ধান্ত মানতে আমরা কুরআনী নির্দেশনায় আদিষ্ট। অন্য এলাকার মুজতাহিদের সিদ্ধান্ত মানতে আদিষ্ট নই।

আর এ উপমহাদেশে ইসলাম যেদিন থেকে এসেছে, সেদিন থেকে হানাফী মাযহাব অনুপাতেই এসেছে। কুরআন ও হাদীস ভিত্তিক যে সমাধান ফিক্বহে হানাফীতে সংকলিত হয়েছে। সে পদ্ধতিতেই আমল জারী হয়েছে।

আর শ্রীলংকায় ইসলাম প্রবেশের সাথে সাথে শাফেয়ী মাযহাব প্রবেশ করেছে।

সুতরাং কুরআনিক বিধান অনুপাতে শ্রীলংকার মুসলমানেরা মতভেদপূর্ণ মাসআলায় শাফেয়ী মাযহাব,আর আমরা বাংলাদেশ,পাকিস্তান ও ভারতীয়রা হানাফী মাযহাব অনুসরণে আদিষ্ট। তেমনি মক্কা মদীনার অনুসারীরা হাম্বলী মালেকী মাযহাব অনুসরণে আদিষ্ট। কারণ তাদের এলাকায় মুজতাহিদ ছিলেন ইমাম আহমাদ বিন হাম্বল ও ইমাম মালেক রহঃ।

মাযহাব মানার প্রশ্ন আসে শুধু মতভেদপূর্ণ ও অস্পষ্ট মাসআলার ক্ষেত্রে। বাকি যে মাসআলাগুলো কুরআন ও হাদীসে পরিস্কার শব্দে আছে। সেসব মাসআলায় মাযহাব অনুসরণের কোন প্রয়োজনও নেই। মাযহাব মানাও হয় না।

যুক্তির খণ্ডন

আপনি যুক্তি দিয়েছেন যে,ইমাম শাফেয়ী রহঃ চার ইমামের একজন ছিলেন। তাই তার অনুসরণে সমস্যা কোথায়?

সমস্যা আছে। চার ইমামের একজন হলেই তার মাসআলা মানতে শুরু করার কথা কোথাও বলা হয়নি। এর একটি মূলনীতি আছে।

চার ইমামকে আমরা হক মানি। কিন্তু চার ইমামের উদ্ভাবিত সকল মাসআলা আমরা আমল করতে পারি না। আমরা আমল করবো শুধু আমাদের ইমামের উদ্ভাবিত মাসআলাই।

যেমন আমাদের নবীর আগের সমস্ত নবীগণই হক। এতে কোন সন্দেহ নেই। সন্দেহ করলে ঈমানই থাকবে না।

কিন্তু আমরা অনুসরণ করবো শুধু আমাদেরই নবীর। পূর্ববর্তীগণ হক হলেও তাদের শরীয়ত আমাদের জন্য আমলযোগ্য নয়। আমরা আমাদের নবীর শরীয়ত মানতে বাধ্য। যদিও পূর্ববর্তী সকল নবীকে হক ও সত্য মানি।

তেমনি আমরা চার ইমামকেই হক মানি। কিন্তু আমল করতে আদিষ্ট শুধু আমাদের ইমামের।

কারণ,আমাদের নবীর শরীয়ত হল নাসেখ তথা রহিতকারী। আর অন্য নবীদের শরীয়ত হল মানসূখ তথা রহিত।  আর নাসেখ থাকতে মানসূখের উপর আমল বৈধ নয়।

তেমনি আমাদের ইমামের বক্তব্যগুলো আমাদের কাছে রাজেহ তথা প্রাধান্য পাওয়া বক্তব্য। আর বাকি ইমামদের বক্তব্যগুলো মারজূহ তথা অপ্রাধান্য পাওয়া বক্তব্য।

রাজেহ থাকা অবস্থায় মারজূহ বক্তব্যের উপর আমল করাও বৈধ নয়।

সহজ কথায়, কুরআনে স্বীয় এলাকার মুজতাহিদের ইজতিহাদকে মানতে আদেশ করা হয়েছে। আর আমাদের এলাকার মুজতাহিদ হলেন ইমাম আবু হানীফা। তাই আমরা তার ইজতিহাদকৃত মাসআলা মানতে আদিষ্ট। শাফেয়ী মাযহাবের ইজতিহাদকৃত মাসআলা মানতে আমরা কুরআনিক নির্দেশ মতে আদিষ্ট নই। তাই এ উপমহাদেশে শাফেয়ী মাযহাব অনুপাতে আমল করে সমাজে ধর্মীয় ফিতনা সৃষ্টি করা বৈধ হবে না। কারণ ফিতনা করা মানুষ হত্যার চেয়েও জঘন্য।

وَالْفِتْنَةُ أَشَدُّ مِنَ الْقَتْلِ ۚ [٢:١٩١

বস্তুতঃ ফেতনা ফ্যাসাদ বা দাঙ্গা-হাঙ্গামা সৃষ্টি করা হত্যার চেয়েও কঠিন অপরাধ। [সূরা বাকারা-১৯১]

والله اعلم بالصواب
উত্তর লিখনে
লুৎফুর রহমান ফরায়েজী

পরিচালক-তালীমুল ইসলাম ইনষ্টিটিউট এন্ড রিসার্চ সেন্টার ঢাকা।

উস্তাজুল ইফতা– জামিয়া কাসিমুল উলুম সালেহপুর, আমীনবাজার ঢাকা।

ইমেইল– ahlehaqmedia2014@gmail.com

Print Friendly, PDF & Email

এটাও পড়ে দেখতে পারেন!

মৃত স্ত্রীকে স্বামী বা মৃত স্বামীকে স্ত্রী গোসল দিতে পারবে কি?

প্রশ্ন স্বামী মারা গেলে স্ত্রী তাকে গোসল দিতে পারবে? স্ত্রী মারা গেলে স্ত্রী তার স্বামীকে …