হোম / প্রশ্নোত্তর / প্রচলিত মিলাদ কিয়াম বিষয়ে বাড়াবাড়ি করার দ্বারা মিলাদ কিয়ামপন্থীরা নিজেরাই কাজটি পরিত্যাজ্য প্রমাণ করছেন!

প্রচলিত মিলাদ কিয়াম বিষয়ে বাড়াবাড়ি করার দ্বারা মিলাদ কিয়ামপন্থীরা নিজেরাই কাজটি পরিত্যাজ্য প্রমাণ করছেন!

প্রশ্ন

আমাদের দেশের একজন বক্তা। নাম মাওলানা এনায়েতুল্লাহ আব্বাসী। তিনি তার এক বয়ানে বলেছেন যে, মিলাদ কিয়াম নিয়ে তিনি বাড়াবাড়ি করেন না। তিনি মিলাদ কিয়ামকে মুস্তাহাব মনে করেন। কিন্তু মিলাদ কিয়ামকে যারা বিদআত বলে তাদের জিব টেনে ছিড়ে ফেলবেন।

সেই সাথে তিনি আরো বলেন, মুস্তাহাব না করলে কোন সমস্যা নেই। কিন্তু ঠাট্টা করলে তার ঈমানই থাকে না।

মাওলানা এনায়েতুল্লাহ আব্বাসী সাহেবের উপরোক্ত কথাগুলোর সত্যতা সম্পর্কে জানতে চাই। এসব কথা কি কুরআন ও হাদীস এবং ফিক্বহের মূলনীতির অনুকূল? নাকি পরিপন্থী? দলীলসহ  জানতে চাই।

উত্তর

بسمم الله الرحمن الرحيم

মাওলানা এনায়েতুল্লাহ  আব্বাসী সাহেব তার উপরোক্ত বক্তব্যে স্পষ্ট স্ববিরোধীতা করেছেন। যেমন-

১ তিনি দাবী করেছেন ঃ মিলাদ কিয়াম বিষয়ে তিনি বাড়াবাড়ি করেন না। আবার বললেন, যে মিলাদ কিয়ামকে বিদআত বলে তাদের জিব টেনে ছিড়ে ফেলবেন।

একটি মুস্তাহাবকে না মানলে তার জিব টেনে ছিড়ে ফেলার হুমকী কি বাড়াবাড়ি নয়?

২ প্রথমে বললেন মুস্তাহাব, আবার বলছেন এটি অস্বিকার করলে নাকি ঈমানই থাকবে না। কি আজীব কথা। মুস্তাহাব অস্বিকার করলে ঈমান চলে যায় এমন কথা উসুলে ফিক্বহের কোন কিতাবে লিখা আছে?

বলছেন মিলাদ কিয়াম নিয়ে বাড়াবাড়ি করেন না, আবার বলছেন যে, এটিকে অস্বিকার করলে তার ঈমানই নাকি চলে যাবে।

মুসলমানদের মুসলমানিত্ব থেকে খারিজ করে দেবার দাবী করা কি বাড়াবাড়ি ও সীমা লঙ্ঘণ নয়?

 

আমরা উপরোক্ত বক্তব্যটিকে দু’টি ভাগে আলোচনা করবোঃ

মুস্তাহাব কাজ না করলে জিব টেনে ছিড়ে ফেলার মত মারাত্মক বাড়াবাড়ি করলে উক্ত মুস্তাহাবটি আর মুস্তাহাব থাকে কি না?

কোন কিছু মুস্তাহাব ও বিদআত হওয়ার মাঝে সন্দেহ হলে করণীয় কী?

মুস্তাহাব অস্বিকার করলে কোন ব্যক্তি ঈমানহারা হয়ে যান কি না?

১ম অংশের জবাব

কোন মুস্তাহাব নিয়ে বাড়াবাড়ি করলে তা আর মুস্তাহাব থাকে না। বরং তা বিদআতে পরিণত হয়। বিশেষ করে জিব টেনে ছিড়ে ফেলার মত সন্ত্রাসী টাইপ খুনে হুমকি দিয়ে বেড়ালেতো তা মুস্তাহাব থাকার প্রশ্নই উঠে না। বরং তা মূলত মুস্তাহাব থাকলেও এরকম বাড়াবাড়ির কারণে বিদআতে পরিণত হয়।

প্রমাণ

قَالَ الطِّيبِيُّ: وَفِيهِ أَنَّ مَنْ أَصَرَّ عَلَى أَمْرٍ مَنْدُوبٍ، وَجَعَلَهُ عَزْمًا، وَلَمْ يَعْمَلْ بِالرُّخْصَةِ فَقَدْ أَصَابَ مِنْهُ الشَّيْطَانُ مِنَ الْإِضْلَالِ فَكَيْفَ مَنْ أَصَرَّ عَلَى بِدْعَةٍ أَوْ مُنْكَرٍ؟ (مرقاة المفاتيح، كتاب الصلاة، باب  الدعاء فى التشهد-3/26، رقم الحديث-946)

ইমাম তীবী রহঃ বলেন, যে ব্যক্তি কোন মুস্তাহাব বিষয়ের উপর জিদ করে এবং সেটিকে দৃঢ় করে নেয়। কখনো সুযোগের উপর আমল না করে। তাহলে নিশ্চয় উক্ত ব্যক্তিকে শয়তান পথভ্রষ্ট করে দিয়েছে।  সুতরাং যে ব্যক্তি বিদআত ও মুনকারের উপর গোঁ ধরে তাদের কী অবস্থা? [মিরকাতুল মাফাতীহ শরহে মিশকাতুল মাসাবীহ-৩/২৬, হাদীস নং-৯৪৬]

২য় অংশের  জবাব

কোন কিছু মুস্তাহাব ও  বিদআত হবার মাঝে মতভেদ হয়ে গেলে তা বর্জন করাই হাদীসের ভাষ্য এবং ফুক্বাহায়ে কেরাম ও সালাফের সিদ্ধান্ত।

হাদীস থেকে প্রমাণ

عَنِ الشَّعْبِيِّ، قَالَ: سَمِعْتُ النُّعْمَانَ بْنَ بَشِيرٍ، قَالَ: سَمِعْتُ النَّبِيَّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، وحَدَّثَنَا عَبْدُ اللَّهِ بْنُ مُحَمَّدٍ، حَدَّثَنَا ابْنُ عُيَيْنَةَ، عَنْ أَبِي فَرْوَةَ، سَمِعْتُ الشَّعْبِيَّ، سَمِعْتُ النُّعْمَانَ بْنَ بَشِيرٍ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُمَا، عَنِ النَّبِيِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، حَدَّثَنَا مُحَمَّدُ بْنُ كَثِيرٍ، أَخْبَرَنَا سُفْيَانُ، عَنْ أَبِي فَرْوَةَ، عَنِ الشَّعْبِيِّ، عَنِ النُّعْمَانِ بْنِ بَشِيرٍ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ، قَالَ: قَالَ النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «الحَلاَلُ بَيِّنٌ، وَالحَرَامُ بَيِّنٌ، وَبَيْنَهُمَا أُمُورٌ مُشْتَبِهَةٌ، فَمَنْ تَرَكَ مَا شُبِّهَ عَلَيْهِ مِنَ الإِثْمِ، كَانَ لِمَا اسْتَبَانَ أَتْرَكَ، وَمَنِ اجْتَرَأَ عَلَى مَا يَشُكُّ فِيهِ مِنَ الإِثْمِ، أَوْشَكَ أَنْ يُوَاقِعَ مَا اسْتَبَانَ، وَالمَعَاصِي حِمَى اللَّهِ مَنْ يَرْتَعْ حَوْلَ الحِمَى يُوشِكُ أَنْ يُوَاقِعَهُ

নু’মান ইবনু বাশীর (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, হালাল সুস্পষ্ট এবং হারামও সুস্পষ্ট, উভয়ের মাঝে বহু অস্পষ্ট বিষয় রয়েছে। যে ব্যাক্তি গুনাহের সন্দেহযুক্ত কাজ পরিত্যাগ করে, সে ব্যাক্তি যে বিষয়ে গুনাহ হওয়া সুস্পষ্ট, সে বিষয়ে অধিকতর পরিত্যাগকারী হবে। পক্ষান্তরে যে ব্যাক্তি গুনাহের সন্দেহযুক্ত কাজ করতে দুঃসাহস করে, সে ব্যাক্তির সুস্পষ্ট গুনাহের কাজে পতিত হবার যথেষ্ট আশংকা রয়েছে। গুনাহসমূহ মহান আল্লাহ্ তা’আলার সংরক্ষিত এলাকা, যে জানোয়ার সংরক্ষিত এলাকার চার পাশে চরতে থাকে, তার ঐ সংরক্ষিত এলাকায় প্রবেশ করার সম্ভাবনা রয়েছে। [বুখারী, হাদীস নং-২০৫১]

وَقَالَ حَسَّانُ بْنُ أَبِي سِنَانٍ: ” مَا رَأَيْتُ شَيْئًا أَهْوَنَ مِنَ الوَرَعِ دَعْ مَا يَرِيبُكَ إِلَى مَا لاَ يَرِيبُكَ

হযরত হাসসান বিন আবী সিনান রহঃ বলেন, আমি পরহেযগারী থেকে সহজ কোন কাজ দেখতে পাইনি।সেটি হল, তোমার কাছে যা সন্দেহযুক্ত মনে হবে, তা পরিত্যাগ করে সন্দেহ মুক্ত কাজ কর। [বুখারী]

عَنْ أَبِي الْحَوْرَاءِ السَّعْدِيِّ، قَالَ: قُلْتُ لِلْحَسَنِ بْنِ عَلِيٍّ: مَا تَحْفَظُ مِنْ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ؟، قَالَ: سَأَلَهُ رَجُلٌ عَنْ مَسْأَلَةٍ لَا أَدْرِي مَا هِيَ؟ فَقَالَ: «دَعْ مَا يَرِيبُكَ إِلَى مَا لَا يَرِيبُكَ

হযরত আবুল হাওরা সা’দী রহঃ থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি একদা হযরত হাসান বিন আলী রাঃ কে বললামঃ আপনি কি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে কোন কিছু মুখস্ত করেছেন? তিনি জবাবে বললেনঃ একদা এক ব্যক্তি একটি মাসআলা বিষয়ে প্রশ্ন করে। জানি না মাসআলাটি কি ছিল? তখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জবাবে বলেছিলেনঃ তুমি সন্দেহযুক্ত বিষয় ছেড়ে দাও এবং সন্দেহ মুক্ত বিষয়ের উপর আমল কর। [সুনানে দারেমী-২/১১৩, হাদীস নং-২৫৩২]

ফিক্বহের কিতাবের প্রমাণ

أَنَّ الْحُكْمَ إذَا تَرَدَّدَ بَيْنَ سُنَّةٍ وَبِدْعَةٍ كَانَ تَرْكُ الْبِدْعَةِ رَاجِحًا عَلَى فِعْلِ السُّنَّةِ (البحر الرائق، كتاب الصلاة، باب مايفسد الصلاة وما يكره فيها-2/35)

যখন কোন হুকুম সুন্নত ও বিদআতের মাঝে সন্দেহযুক্ত হয়ে যাবে, তখন বিদআত হিসেবে তা পরিত্যাগ করাই প্রাধান্য পাবে সুন্নত হিসেবে তা করার উপর। [আলবাহরুর রায়েক-২/৩৫]

وَمَا تَرَدَّدَ بِهِ بَيْنَ الْبِدْعَةِ وَالسُّنَّةِ يَتْرُكُ (الفتاوى الهندية، كتاب الصلاة، الْبَابُ الثَّانِي وَالْعِشْرُونَ فِي السَّجَدَاتِ-1/169

যে বিষয় সুন্নত ও বিদআত হওয়া নিয়ে সংশয় তৈরী হয়, তখন সেটিকে ছেড়ে দিবে। [ফাতাওয়ায়ে আলমগীরী-১/১৬৯]

وَمَا تَرَدَّدَ بَيْنَ السُّنَّةِ وَالْبِدْعَةِ يَتْرُكُهُ (رد المحتار، كتاب الصوم، باب الاعتكاف-3/430

যে বিষয় সুন্নত ও বিদআত হওয়া নিয়ে সংশয় তৈরী হয়, তখন সেটিকে ছেড়ে দিবে। [ফাতাওয়ায়ে শামী-৩/৪৩০]

৩য় অংশের জবাব

উপরোক্ত আলোচনার দ্বারা আমাদের কাছে পরিস্কার যে, যে বিষয় সুন্নত ও বিদআত হওয়া নিয়ে সংশয় হবে, সেটিকে বর্জন করাই শরীয়ত।

সেখানে প্রচলিত মিলাদ কিয়াম যা নিয়ে মতভেদ তৈরী হয়েছে। সেটিকে হাদীসের ভাষ্য ও ফুক্বাহাগণের বক্তব্য অনুপাতে পরিত্যাগ করাই শরীয়তের বিধান। সেখানে সেটিকে অস্বিকার করলে ইসলাম থেকে বের হবার দাবী করা অজ্ঞতা ছাড়া আর কী হতে পারে?

যেখানে সুন্নত ও বিদআত নিয়ে সংশয় তৈরী হলেই তা পরিত্যাগ করার কথা ফুক্বাহায়ে কেরামগণ স্পষ্ট উল্লেখ করেছেন। সেখানে মুস্তাহাব ও বিদআত হওয়া নিয়ে সংশয় হলে সেটি যে পরিত্যাজ্য হবে এতে কোন সন্দেহই থাকার কথা নয়।

উপরোক্ত আলোচনা দ্বারা কয়েকটি বিষয় আমাদের কাছে পরিস্কার। যথা-

প্রচলিত মিলাদ কিয়াম বিদআত। কিন্তু কতিপয় ভাইদের কাছে তা মুস্তাহাব।

আর মুস্তাহাব ও বিদআতের মাঝে মতভেদ হয়ে যাওয়ায় হাদীসের ভাষ্য ও ফক্বীহদের বক্তব্য অনুপাতে তা পরিত্যাগ করাই শরীয়তের বিধান।

প্রচলিত মিলাদকে মুস্তাহাব বলার পরও এটিকে বিদআত সাব্যস্তকারীদের জিব টেনে ছিড়ে ফেলার হুমকি দেয়া এবং ইসলাম থেকে খারিজ বক্তব্য দেবার মাধ্যমে চরম পর্যায়ের বাড়াবাড়ি করার কারণে উক্ত কাজটি মুস্তাহাব ধরে নিলেও তা বিদআত ও পরিত্যাজ্য হিসেবে প্রমাণিত হয়েছে।

সুতরাং এ বিদআত থেকে মুক্ত থাকা প্র্রতিটি ঈমানদের উপর কর্তব্য।

والله اعلم بالصواب
উত্তর লিখনে
লুৎফুর রহমান ফরায়েজী

পরিচালক-তালীমুল ইসলাম ইনষ্টিটিউট এন্ড রিসার্চ সেন্টার ঢাকা।

উস্তাজুল ইফতা– জামিয়া কাসিমুল উলুম সালেহপুর, আমীনবাজার ঢাকা।

ইমেইল– ahlehaqmedia2014@gmail.com

 

 

Print Friendly, PDF & Email

এটাও পড়ে দেখতে পারেন!

তারাবীহ সালাতের চার রাকাত পর বসে প্রচলিত “সুবহানা জিলমুলুকি ওয়ালমালাকুতু” যে দুআ পড়া হয় এর কোন ভিত্তি আছে কি?

প্রশ্ন আসসালামু আলাইকুম ওয়ারাহমাতুল্লাহি ওয়াবারকাতুহ। ১) তারাবীহ নামাজের চার রাকাত পর পর কোন দোয়া পড়া …