হোম / ঈমান ও আমল / শবে বরাতের রাতে মসজিদে সম্মিলিত ইবাদতের বিধান কী?

শবে বরাতের রাতে মসজিদে সম্মিলিত ইবাদতের বিধান কী?

প্রশ্ন

From: মুহাম্মদ বেলাল হোসাইন
বিষয়ঃ শবে বারআতের প্রচলিত কয়েকটি আমল প্রসঙ্গে

প্রশ্নঃ
আসসালামু আলাইকুম।
মুহাম্মদ বেলাল হোসাইন
সাটিরপাড়া নরসিংদী।
হযরতে কাছে কয়েকটি বিষয়ে সমাধান চাইছিলাম। অনুগ্রহ করে জানিয়ে বাধিত করবেন।
আমার প্রথম প্রশ্ন হলো -শবে বারআতের রাতকে উদ্দেশ্য করে সম্মিলিত কোন আমল করা শরীয়তের দৃষ্টিতে কেমন?
২য় প্রশ্ন হলো ঐ রাতে  সময় নির্ধারন করে যেমন রাত ১২টা বা১টা ২টার দিকে মৌখিক ভাবে অথবা মাইক দিয়ে এলান করে মুসল্লিদেরকে জড়ো করে সম্মিলিত ভাবে জিকির করা,  মুনাজাত করা যাবে কি না? উল্লেখ্য এই আমলটা প্রতি শবে বারআতে ইশার নামাজের পর মুসল্লিগন আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত গ্রহন করে যে রাত ১২টা বা ১টায় করা হবে। কিন্তু গত বৃহস্পতিবার শবে বারআতের রাতে এই পদ্ধতিতে জিকির, মুনাজাত ইত্যাদি সম্মিলিত ভাবে করা যাবেনা এবং একা একা করতে হবে বলে জানান। এবং ঐ রাতে উল্লেখিত নিয়মে কোন আমল হয়নি। প্রশ্ন হলো হুজুরের কথা ঠিক আছে কিনা?
৩য় প্রশ্ন,  ঐ রাতকে কেন্দ্র করে মসজিদে কোন প্রকার খাবারের আয়োজন যেমন মিষ্টি, বিরিয়ানি ইত্যাদির আয়োজন করা যাবে কিনা?
৪র্থ প্রশ্ন ঐরাতকে কেন্দ্র করে ইশার জামাতের নির্ধারিত সময় থেকে এক-দেড় ঘন্টা দেরী করে পড়া কেমন?
উত্তর গুলি জানা খুবই আবশ্যক তাই হযরতের কাছে বিনীত অনুরোধ দলিল প্রমানের আলোকে জবাবগুলি শিগ্রই জানাবেন।

উত্তর

وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته

بسم الله الرحمن الرحيم

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যা করেছেন, তা যেমন সুন্নত, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যা ছেড়ে দিয়েছেন তা ছেড়ে দেয়াও সুন্নত।

আমাদের নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইবাদত সম্পর্কিত যে কাজগুলো করেননি।বা যে পদ্ধতিতে করেননি। সেগুলোকে ইবাদত মনে করে, নতুন পদ্ধতিতে গুরুত্ব সহকারে আদায় করাই বিদআত।

এখানে লক্ষ্যণীয় হল, বিদআত হতে হলেঃ

কাজ বা পদ্ধতিটিকে বিশেষ সওয়াবের কাজ মনে করতে হবে।

পদ্ধতিটি কুরআন ও সুন্নাহ সমর্থিত না হতে হবে।

যদি উপরোক্ত শর্তগুলো পাওয়া যায়, তাহলে উক্ত কাজটি বিদআত। আর প্রতিটি বিদআতই হল গোমরাহী। আর প্রতিটি গোমরাহীই পরিত্যাজ্য।

উপরোক্ত মূলনীতি বুঝার পর এবার শবে বারাআত সম্পর্কিত বিষয়টি বুঝে নিনঃ

শবে বারাআত তথা লাইলাতুন নিসফি মিন শাবান একটি ফযীলতময় রাত। এ রাতে মুশরিক ও হিংসুক ছাড়া সকল মুসলিমদের আল্লাহ ক্ষমা করে দেন মর্মে  বিশুদ্ধ হাদীসে বর্ণিত হয়েছে। এছাড়া কিছু গ্রহণযোগ্য হাদীসে আরো বিভিন্ন ফযীলতের কথা বর্ণিত হয়েছে।

শবে বরাতের ফযীলত সম্পর্কে জানতে পড়ুনঃ

শবে বরাতঃ সীমালঙ্ঘণ ও সীমা সংকোচনমুক্ত মানসিকতা রাখা উচিত

সুতরাং এ রাত মহামান্বিত রাত। এ রাতে বেশি বেশি ইবাদত ও রোনাজারীতে কাটানো উচিত।

কিন্তু এ রাতের জন্য আলাদা বিশেষ কোন ইবাদত যেমন শত রাকাত নামায, বিশেষ পদ্ধতির নামায ইত্যাদি প্রমাণিত নয়। নয় সম্মিলিত কোন ইবাদতও।

তাই এ রাতে সম্মিলিত ইবাদত করাকে গুরুত্ব দেয়া বিদআতের আওতাধীন হবে।

এ রাতকে উপলক্ষ্য করে বিশেষ খাবারের আয়োজন, সম্মিলিত জিকির অনুষ্ঠান, নির্ধারিত জামাত দেরী করা পড়া, ইত্যাদি কাজকে গুরুত্ব সহকারে, বিশেষ সওয়াবের কাজ মনে করা বিদআত। এতে কোন সন্দেহ নেই।

তাই এমন কর্ম থেকে বিরত থাকা প্রতিটি ঈমানদারদের জন্যই কর্তব্য।

তবে এমনিতেই যদি মুসল্লিগণ একত্র হন। কিছু দ্বীনী কথা শুনতে চান। তাহলে তাদের কিছু নসিহত করা, ইবাদতের গুরুত্ব বুঝানো, জিকিরের তালিম প্রদান করা ইত্যাদিতে কোন সমস্যা নেই।

পার্থক্য ভাল করে বুঝে নিনঃ

বিদআত হতে হলে, উপরোক্ত পদ্ধতিগুলোকে বিশেষ সওয়াবের কাজ মনে করে গুরুত্ব সহকারে একত্র হতে হবে।

আর একত্র হওয়াকে বিশেষ সওয়াবের কাজ মনে না করে এবং একত্রিত হবার ঘোষণা ছাড়াই মুসল্লিগণ মসজিদে জড়ো হলে, তাদের আগ্রহের ভিত্তিতে কিছু দ্বীনী কথা বলা, তালীম করাতে কোন সমস্যা নেই। তা বিদআত হবে না। বরং নিয়ত বিশুদ্ধ থাকলে অবশ্যই সওয়াব হবে। বিশেষ পদ্ধতির কারণে নয়। বরং দ্বীনী ওয়াজ ও তালীমের কারণে সওয়াব হবে।।

তবে যে এলাকায়, এ বিষয়ে মানুষ পার্থক্য করতে জানে না। সেসব এলাকায় এসব সম্মিলিত কার্যক্রম সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেয়াই নিরাপদ।

وَالْمُتَابَعَةُ كَمَا تَكُونُ فِي الْفِعْلِ تَكُونُ فِي التَّرْكِ أَيْضًا، فَمَنْ وَاظَبَ عَلَى فِعْلٍ لَمْ يَفْعَلْهُ الشَّارِعُ، فَهُوَ مُبْتَدِعٌ.  (مرقاة المفاتيح، مقدمة، حديث انما الأعمال بالنيات-1/94-95)

অনুসরণ যেমনিভাবে কোন কাজ করার মাধ্যমে হয়, তেমনি কোন কাজ ছেড়ে দেবার মাধ্যমেও হয়ে থাকে। সুতরাং গুরুত্ব সহকারে যদি কেউ এমন কাজ করে যা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম করেননি। তাহলে উক্ত ব্যক্তি বিদআতি।[মিরকাতুল মাফাতীহ-১/৯৪-৯৫]

ومنها التزام الكيفيات والهيئات المعينة كالذكر بهيئة الإجتماع  على صوت واحد واتخاذ يوم ولادة النبى صلى الله عليه وسلم عيدا، وما اشبه ذلك.. الخ (الإعتصام-1/29

 বিদআতসমূহের মধ্য হতে একটি হল, বিশেষ পদ্ধতি এবং নির্দিষ্ট ধরণকে আবশ্যক করে নেয়া। যেমন সম্মিলিতভাবে এক সুরে জিকির করা এবং নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জন্মদিনে ঈদ পালন করা ইত্যাদি। [আলইতিসাম-১/২৭]

فَإِذَا نَدَبَ الشَّرْعُ مَثَلًا إِلَى ذِكْرِ اللَّهِ، فَالْتَزَمَ قَوْمٌ الِاجْتِمَاعَ عَلَيْهِ عَلَى لسان واحد، أو صوت واحد، أَو فِي وَقْتٍ مَعْلُومٍ مَخْصُوصٍ عَنْ سَائِرِ الأَوقات، لَمْ يَكُنْ فِي نَدْبِ الشَّرْعِ مَا يَدُلُّ عَلَى هَذَا التَّخْصِيصِ المُلْتَزَم، بَلْ فِيهِ مَا يَدُلُّ عَلَى خِلَافِهِ؛

যখন শরীয়ত কোন জিনিসের উৎসাহ দিল, যেমন আল্লাহর যিকিরের প্রতি। সুতরাং যদি কোন দল সম্মিলিতভাবে সমস্বরে একই সুরে, বা নির্দিষ্ট সময়ে জিকির করাকে আবশ্যক করে নেয়। তাহলে শরীয়তের উৎসাহদানটি উক্ত নির্দিষ্ট করে আবশ্যক করে নেয়া সময়কে বুঝায় না। বরং এর উল্টোটা বুঝায়। [আলইতিসাম-১/১৮৩]

والله اعلم بالصواب
উত্তর লিখনে
লুৎফুর রহমান ফরায়েজী

পরিচালক-তালীমুল ইসলাম ইনষ্টিটিউট এন্ড রিসার্চ সেন্টার ঢাকা।

উস্তাজুল ইফতা– জামিয়া কাসিমুল উলুম সালেহপুর, আমীনবাজার ঢাকা।

ইমেইল– ahlehaqmedia2014@gmail.com

Print Friendly, PDF & Email

এটাও পড়ে দেখতে পারেন!

তালাকের আবেদনের প্রেক্ষিতে “আরেকবার বললে যা বলছো তা’ই হবে” বলার দ্বারা তালাক হয় কি?

প্রশ্ন বরাবর, মুহতামিম সাহেব, আসসালামু আলাইকুম। সম্মনিত মুফতি সাহেব। যদি স্বামী স্ত্রী ঝগড়ার এক পর্যায়ে …