হোম / আহলে হাদীস / অপবাদের কবলে ফাযায়েলে আমাল [পর্ব-১৩] কাবীর আহমাদ রেফায়ী রহঃ এর রূহ পাঠানোর কথা কি কুফরী নয়?

অপবাদের কবলে ফাযায়েলে আমাল [পর্ব-১৩] কাবীর আহমাদ রেফায়ী রহঃ এর রূহ পাঠানোর কথা কি কুফরী নয়?

প্রশ্ন

আলহামদুলিল্লাহ। কবীর আহমাদ রেফায়ী রহঃ এর কারামত সম্পর্কিত যে উত্তর আপনারা  দালিলীকভাবে প্রদান করেছেন, তাতে আমাদের কাছে বিষয়টি পরিস্কার হয়ে গেছে যে, উক্ত ঘটনাটি একটি ঐতিহাসিক সত্য ঘটনা। এটিকে অস্বিকার করার কোন সুযোগ নেই। কিন্তু এখানে আরেকটি বিষয় থেকে যায়। তাহল, উক্ত ঘটনায় কাবীর আহমাদ রেফায়ী বলছেন যে, “দূরে থাকা অবস্থায় আমি আমার রূহকে আপনার খিদমাতে পাঠাতাম। সে আমার প্রতিনিধি হয়ে আস্তিন মুবারক চুম্বন করতো”।

একথাকো কুফরী কথা।

এ বিষয়ে ব্যাখ্যা জানতে চাই।

উত্তর

بسم الله الرحمن الرحيم

হযরত সুফিয়ায়ে কেরাম রহঃ এর বক্তব্য ও কর্ম বিষয়ে ইমাম নববী রহঃ [মৃত্যু ৬৭৬ হিজরী] বলেনঃ

من لا تحقيق عنده أنه مخالف ليس بمخالف بل يجب تأويل أفعال أولياء الله تعالى

যার কাছে সঠিক জ্ঞান নেই, তারা মনে করে সুফীদের কথা কুরআন ও হাদীসের বিপরীত, আসলে বিপরীত নয়। বরং ওলীদের কথাগুলোকে কুরআন ও হাদীসের আনুকূলে ব্যাখ্যা করা ওয়াজিব। [বুস্তানুল আরেফীন-৭৩]

স্ক্রীণ শর্ট

new-01

বুঝা গেল যে, সুফিয়ায়ে কেরাম রহঃ গণের সেইসব ইবারত যা বাহ্যিকভাবে কুরআনও হাদীসের বিপরীত মনে হবে, তাহলে এসব ইবারতের কুরআন ও হাদীসের উপযোগী ব্যাখ্যা করতে হবে।

একইভাবে গায়রে মুকাল্লিদদের শায়েখ নওয়াব সিদ্দীক হাসান খান সাহেব লিখেছেনঃ

وأقول في هذا الكتاب: إن الصواب: ما ذهب إليه الشيخ أحمد السرهندي – مجددُ الألف الثاني -، والشيخ الأجلُّ مسنِدُ الوقت أحمدُ وليُّ الله – المحدَّث الدهلويُّ -، والإمام المجتهد الكبير محمد الشوكاني؛ من قبول كلامه الموافق لظاهر الكتاب والسنة، وتأويل كلامه الذي يخالف ظاهرهما، تأويله بما يُستحسن من المحامل الحسنة، وعدم التفوه فيه بما لا يليق بأهل العلم والهدى،

অনুবাদঃ আর আমরা বলবো এ বিষয়ে [সুফীয়ায়ে কেরামের বক্তব্য ও কর্মকান্ড বিষয়ে] যা বলেছেন শায়েখ আহমাদ সেরহেন্দী মুজাদ্দিদে আলফে সানী এবং শায়েখ মুসনিদুল ওয়াক্ত আহমাদ ওয়ালী উল্লাহ মুহাদ্দিসে দেহলবী ও ইমাম, মুজতাহিদে কাবীর মুহাম্মদ শাওকানী রহঃ। সেটি হল, তাদের সেই কথা গ্রহণ করা হবে যা কুরআন ও সুন্নাহের বাহ্যিক নসের অনুকূল। আর যা কুরআন ও সুন্নাহের বাহ্যিকতা বিপরীত সেটির ব্যাখ্যা করবো। [আততাজুল মুকাল্লাল-১৬৯]

আততাজুল মুকাল্লাল স্ক্রীণ শর্ট

new-02

সুতরাং ইমাম নববী রহঃ, শাহ ওয়ালী উল্লাহ রহঃ এবং খোদ গায়রে মুকাল্লিদ উলামাগণ একথা স্বীকার করেছেন যে, সুফীয়ায়ে কেরামগণের সেই সকল  বক্তব্য যা বাহ্যিকভাবে কুরআন ও হাদীসের বিপরীত দেখা যাবে, সেগুলোকে বোকার মত মুর্খতার পরিচয় দিয়ে দ্রুত কুফরীর ফাতওয়া আরোপ করা যাবে না। বরং সেগুলোর উপযোগী ব্যাখ্যা করতে হবে।

সেই হিসেবে শায়েখ কাবীর আহমাদ রেফায়ী রহঃ উক্ত কবিতার অর্থ করতে হবে এভাবেঃ

“দূরে থাকা অবস্থায় আমি [কাবীর আহমাদ রেফায়ী রহঃ] রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের খিদমাতে দরূদ পাঠাতাম। এখনতো আমি স্বশরীরে উপস্থিত [রাওযা পাশে] এবার আপনি আপনার হাত মুবারক দিন, যেন আমি তা চুম্বন করতে পারি”।

উপরোক্ত সঠিক ব্যাখ্যা করলে আর উক্ত কথা তথা “আপনার খিদমাতে রূহ পাঠাতাম” বক্তব্যের মাঝে কোন কুফরীর সন্দেহও বাকি থাকে না। আর সুফীদের বক্তব্যের ক্ষেত্রে এরকম সঠিক ও উপযোগী ব্যাখ্যা করাই হল উলামায়ে হকের মত। যা উপরে বর্ণিত হয়েছে।

বাহ্যিকভাবে কুফরী নজরে আসলে উপযোগী ব্যাখ্যা করতে এটি শুধু আমাদের আমল নয়, বরং গায়রে মুকাল্লিদ উলামাগণও করেছেন। যেমন বুখারীর হাদীসঃ

عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ، قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: ” إِنَّ اللَّهَ قَالَ: مَنْ عَادَى لِي وَلِيًّا فَقَدْ آذَنْتُهُ بِالحَرْبِ، وَمَا تَقَرَّبَ إِلَيَّ عَبْدِي بِشَيْءٍ أَحَبَّ إِلَيَّ مِمَّا افْتَرَضْتُ عَلَيْهِ، وَمَا يَزَالُ عَبْدِي يَتَقَرَّبُ إِلَيَّ بِالنَّوَافِلِ حَتَّى أُحِبَّهُ، فَإِذَا أَحْبَبْتُهُ: كُنْتُ سَمْعَهُ الَّذِي يَسْمَعُ بِهِ، وَبَصَرَهُ الَّذِي يُبْصِرُ بِهِ، وَيَدَهُ الَّتِي يَبْطِشُ بِهَا، وَرِجْلَهُ الَّتِي يَمْشِي بِهَا، وَإِنْ سَأَلَنِي لَأُعْطِيَنَّهُ، وَلَئِنِ اسْتَعَاذَنِي لَأُعِيذَنَّهُ، وَمَا تَرَدَّدْتُ عَنْ شَيْءٍ أَنَا فَاعِلُهُ تَرَدُّدِي عَنْ نَفْسِ المُؤْمِنِ، يَكْرَهُ المَوْتَ وَأَنَا أَكْرَهُ مَسَاءَتَهُ “

হযরত আবূ হুরায়রা রাঃ থেকে বর্ণিত। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, নিশ্চয় আল্লাহ তাআলা বলেন, যে ব্যক্তি আমার কোন ওলীর সাথে শত্রুতা করে, আমি তার সাথে যুদ্ধ ঘোষনা করি। বান্দা আমার নৈকট্য অর্জনের জন্যে ফরয আদায়ের চাইতে প্রিয় কোন কাজ করেনি। আর বান্দা নফল ইবাদতের মাধ্যমে আমার নৈকট্য লাভ করতে থাকে, এক পর্যায়ে আমি তাকে ভালবেসে ফেলি। আর আমি যখন তাকে ভালবাসি, তখন আমি তার চোখ, কান, হাত ও পা হয়ে যাই, যা দ্বারা সে দেখে, শোনে, ধরে ও চলে।

যদি সে আমার কাছে চায় তাহলে তাকে তা দিয়ে দেই, যদি আমার আশ্রয় কামনা করে, তাহলে আশ্রয় দান করি। আমি কোন কাজ করতে কোন দ্বিধা করি না, যতটা দ্বিধা করি মু’মিন বান্দার প্রাণ নিতে। সে মৃত্যুকে অপছন্দ করে আর আমি তার বেচে থাকাকে অপছন্দ করি। [বুখারী, হাদীস নং-৬৫০২]

new-03

উক্ত হাদীসের বাহ্যিক অর্থ শরয়ী নীতির উল্টো মনে হয়। কারণ এতে আল্লাহ নিজে বান্দার হাত হয়ে যাচ্ছেন, বান্দার চোখ হয়ে যাবার কথা এসেছে।

এখন কি বলা হবে যে, বুখারীর হাদীসে কুফরী কথা আছে? নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কুফরী কথা বলেছেন? নাউজুবিল্লাহ মিন জালিক।

নিশ্চয় এখানে ব্যাখ্যা করতে। উপযোগী ব্যাখ্যা। গায়রে মুকাল্লিদ উলামাগণও তা করেছেন। যেমন-

লা-মাযহাবী আলেম দাউদ রায সাহেব লিখেছেনঃ “তার [মানে অধিক নফল আদায়কারী বান্দা] জাহেরী ও বাতেনী সকল কর্মকান্ড শরীয়তের অনুগত হয়ে যায়। সে হাত, পা, কান দ্বারা শুধু সেই কাজই করে, যাতে আল্লাহ তাআলা সন্তুষ্ট। [সহীহ বুখারী, তরজমায়ে দাউদ রাজ-৭/৭২৯, হাদীস নং-৬৫০২, প্রকাশক-মার্কাযী জমিয়তে আহলে হাদীস, হিন্দ]

স্ক্রীণ শর্ট

new-04

তো যেখানে হাদীসের ইবারতে ব্যাখ্যা হতে পারে, সেখানে পূর্ণ সুন্নতের পাবন্দ আল্লাহওয়ালা বুযুর্গদের বক্তব্যের ক্ষেত্রে কেন তাবীল তথা উপযোগী ব্যাখ্যা করা যাবে না?

অথচ লা-মাযহাবী শায়েখগণই বলেছেন যে, সুফীদের কথার উপযোগী ব্যাখ্যা করা উচিত। কুফরীর ফাতওয়া দ্রুত দেয়া উচিত নয়।

আর শায়েখ জাকারিয়া রহঃ কাবীর আহমাদ রেফায়ী রহঃ এর ঘটনা নকল করার আগে অনেক পূর্বসূরী মুহাদ্দিস, ফক্বীহ, উলামাগণ উক্ত ঘটনাকে নকল করেছেন। তাদের কারো নজরে সেটি শিরক ও কুফরী মনে হয়নি। কিন্তু বর্তমান জমানার অধুনা পন্ডিত লা-মাযহাবীদের কাছে শিরক হয়ে গেল?

আমাদের বিনীত প্রশ্ন

আমরা ইতোপূর্বে উল্লেখ করেছি উলামাদের এক জামাত উক্ত ঘটনাকে ইতোপূর্বে স্বীয় কিতাবে তা এনেছেন। যাদের রেফারেন্সে শায়েখ জাকারিয়া রহঃ ফাযায়েলে সাদাকাতে তা নকল করেছেন। এখন ফাযায়েলে সাদাকাতে শায়েখ জাকারিয়া রহঃ উক্ত ঘটনা নকল করার কারণে যদি তিনি শিরক ও কুফরী করে থাকেন, তাহলে একই ফাতওয়াতো প্রথমে প্রযোজ্য হবে পূর্বসূরী মুহাদ্দিস ও উলামাগণের উপর। তো লা-মাযহাবী দোস্তরা কি একই ফাতওয়া পূর্বসূরী মুহাদ্দিসগণের উপরও আরোপ করতে পারবেন? নাকি জিঘাংসার লক্ষ্যবস্তু শুধু শায়েখ জাকারিয়া রহঃ এবং উলামায়ে দেওবন্দই?

والله اعلم بالصواب
উত্তর লিখনে
লুৎফুর রহমান ফরায়েজী

পরিচালক-তালীমুল ইসলাম ইনষ্টিটিউট এন্ড রিসার্চ সেন্টার ঢাকা।

উস্তাজুল ইফতা– জামিয়া কাসিমুল উলুম সালেহপুর, আমীনবাজার ঢাকা।

ইমেইল– ahlehaqmedia2014@gmail.com

Print Friendly, PDF & Email

এটাও পড়ে দেখতে পারেন!

তালাকের আবেদনের প্রেক্ষিতে “আরেকবার বললে যা বলছো তা’ই হবে” বলার দ্বারা তালাক হয় কি?

প্রশ্ন বরাবর, মুহতামিম সাহেব, আসসালামু আলাইকুম। সম্মনিত মুফতি সাহেব। যদি স্বামী স্ত্রী ঝগড়ার এক পর্যায়ে …