হোম / ঈমান ও আমল / দলীলের আলোকে জিলহজ্ব ও কুরবানীঃ আমাল ও মাসায়েল!

দলীলের আলোকে জিলহজ্ব ও কুরবানীঃ আমাল ও মাসায়েল!

কুরআনে কারীমের ভাষ্যমতে চারটি মাস অধিক সম্মানিত। আল্লাহ তাআলা বলেন,

اِنَّ عِدَّةَ الشُّهُوْرِ عِنْدَ اللّٰهِ اثْنَا عَشَرَ شَهْرًا فِیْ كِتٰبِ اللّٰهِ یَوْمَ خَلَقَ السَّمٰوٰتِ وَ الْاَرْضَ مِنْهَاۤ اَرْبَعَةٌ حُرُمٌ.

আল্লাহ যেদিন আসমান যমীন সৃষ্টি করেছেন সেইদিন থেকেই মাসসমূহের গণনা আল্লাহ তাআলার নিকট তাঁর বিধান মতে বারটি। তন্মধ্যে চারটি মাস সম্মানিত’। -সুরা তাওবা (৯) : ৩৬

এই চারটি মাসের অন্যতম হল যিলহজ্ব মাস। আর এ মাসের সবচেয়ে উৎকৃষ্ট ও ফযীলতপূর্ণ সময় হল‘আশারায়ে যিলহজ্ব’ অর্থাৎ যিলহজ্ব মাসের প্রথম দশক।

যিলহজ্ব মাসের প্রথম দশকের মাহাত্ম্য ও গুরুত্ব অপরিসীম। কেননা আল্লাহ তাআলা এই দশকের রাত্রীর শপথ করেছেন কুরআনে কারীমে। ইরশাদ হয়েছে, وَ الْفَجْرِۙ وَ لَیَالٍ عَشْرٍ ‘শপথ ফযরের, শপথ দশ রাত্রির’।Ñসূরা ফাজর (৮৯) : ১-২

হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা. ও মুজাহিদ রাহ.সহ অনেক সাহাবী, তাবেঈ ও মুফাসসির বলেন, এখানে‘দশ রাত্রি’ দ্বারা যিলহজ্বের প্রথম দশ রাতকেই বুঝানো হয়েছে। Ñতাফসীরে ইবনে কাসীর ৪/৫৩৫

এই দশ দিনের নেক আমল আল্লাহ তাআলার নিকট সবচেয়ে প্রিয়। হাদীস শরীফে এসেছে, হযরত ইবনে আব্বাস বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন,

مَا مِنْ أَيَّامٍ الْعَمَلُ الصَّالِحُ فِيهَا أَحَبُّ إِلَى اللَّهِ مِنْ هَذِهِ الْأَيَّامِ يَعْنِي أَيَّامَ الْعَشْرِ، قَالُوا: يَا رَسُولَ اللَّهِ، وَلَا الْجِهَادُ فِي سَبِيلِ اللَّهِ؟ قَالَ: وَلَا الْجِهَادُ فِي سَبِيلِ اللَّهِ، إِلَّا رَجُلٌ خَرَجَ بِنَفْسِهِ وَمَالِهِ، فَلَمْ يَرْجِعْ مِنْ ذَلِكَ بِشَيْءٍ.

অর্থাৎ আল্লাহর নিকট যিলহজ্বের দশ দিনের নেক আমলের চেয়ে অধিক প্রিয় অন্য কোনো দিনের আমল নেই। সাহাবায়ে কেরাম আরজ করলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আল্লাহর রাস্তায় জিহাদও (এর চেয়ে উত্তম) নয়?তিনি বললেন, না, আল্লাহর রাস্তায় জিহাদও নয়। তবে হাঁ, সেই ব্যক্তির জিহাদের চেয়ে উত্তম যে নিজের জান-মাল নিয়ে আল্লাহর রাস্তায় জিহাদের জন্য বের হয়েছে। অতপর কোনো কিছু নিয়ে ঘরে ফিরে আসেনি।Ñসুনানে আবু দাউদ, হাদীস ২৪৩৮; সহীহ বুখারী, হাদীস ৯৬৯; জামে তিরমিযী, হাদীস ৭৫৭; সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদীস ১৭২৭; মুসনাদে আহমদ, হাদীস ১৯৬৮

আরেকটি হাদীসে এসেছে, হযরত জাবির রা. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন,

أَفْضَلُ أَيَّامِ الدُّنْيَا أَيَّامُ الْعَشْرِ، عَشْرِ ذِي الْحِجَّةِ، قَالَ: وَلَا مِثْلُهُنَّ فِي سَبِيلِ اللَّهِ؟ قَالَ: لَا مِثْلُهُنَّ فِي سَبِيلِ اللَّهِ , إِلَّا رَجُلٌ عَفَّرَ وَجْهَهُ فِي التُّرَابِ.

অর্থাৎ দুনিয়ার সর্বোত্তম দিনগুলো হল, যিলহজ্বের দশদিন। জিজ্ঞাসা করা হল, আল্লাহর রাস্তায়ও কি তার সমতুল্য নেই? তিনি বললেন, আল্লাহর রাস্তায়ও তার সমতুল্য নেই। তবে ঐ ব্যক্তি যার চেহারা ধুলিযুক্ত হয়েছে। অর্থাৎ শাহাদাত লাভ করেছে। Ñমুসনাদে বাযযার, হাদীস ১১২৮; মুসনাদে আবু ইয়ালা, হাদীস ২০১০; মাজমাউল যাওয়াইদ ৪/৮; (قال الهيثمي : إسناده حسن ورجاله ثقات) হাদিসটির সনদ হাসান

এসব হাদীসের কারণেই যিলহজ্বের প্রথম দশকের আমলকে অত্যন্ত গুরুত্ব দেওয়া হয়। এই দশকের মধ্যে বেশ কয়েকটি আমল রয়েছে। যেমন ১. নখ-চুল না কাটা। ২. রাত্রগুলোতে বেশি যিকর-তাসবীহ করা। ৩. প্রথম নয় দিন রোযা রাখা। ৪. আরাফার দিন অর্থাৎ নয় যিলহজ্ব রোযা রাখা। ৫. তাকবীরে তাশরীক পড়া। ৬. কুরবানী করা। ৭. ঈদুল আযহার নামায পড়া। ৮. ঈদ ও আইয়ামে তাশরীকে রোযা না রাখা।

নিম্নে এসব বিষয়ের হাদীস এবং সংশ্লিষ্ট মাসায়েল আলোচনা করা হবে ইনশাআল্লাহ।

নখ-চুল না কাটা

عَنْ أُمِّ سَلَمَةَ، أَنَّ النَّبِيَّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: إِذَا رَأَيْتُمْ هِلَالَ ذِي الْحِجَّةِ، وَأَرَادَ أَحَدُكُمْ أَنْ يُضَحِّيَ، فَلْيُمْسِكْ عَنْ شَعْرِهِ وَأَظْفَارِهِ.

অর্থ : উম্মে সালামা রা. থেকে বর্ণিত, নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, যখন যিলহজ্বের দশক শুরু হবে তখন তোমাদের মধ্যে যে কুরবানী করবে সে যেন তার চুল নখ না কাটে। Ñসহীহ মুসলিম,হাদীস ১৯৭৭; জামে তিরমিযী, হাদীস ১৫২৩

এই হাদীসের উপর ভিত্তি করে ফকীহগণ কুরবানীকারীরর জন্য নখ-চুল না কাটাকে মুস্তাহাব বলেছেন। তবে এ হুকুম তাদের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য হবে যারা যিলকদের শেষে নখ-চুল কেটেছে। অন্যথায় নখ-চুল বেশি লম্বা হয়ে যাবে। যা সুন্নাতের খেলাফ। আর যে ব্যক্তি কুরবানী করবে না তার জন্য এ হুকুম প্রযোজ্য কি না এ ব্যাপারে কেউ কেউ বলেছেন, এ হুকুম শুধুমাত্র কুরবানীকারীদের জন্য প্রযোজ্য। তাদের দলীল পূর্বোক্ত হাদীস। আর কেউ কেউ বলেন, কুরবানী যারা করবে না তাদের জন্যও। তাদের দলীল হল :

عَنْ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ عَمْرِو بْنِ الْعَاصِ، أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ لِرَجُلٍ: أُمِرْتُ بِيَوْمِ الْأَضْحَى عِيدًا جَعَلَهُ اللَّهُ عَزَّ وَجَلَّ لِهَذِهِ الْأُمَّةِ، فَقَالَ الرَّجُلُ: أَرَأَيْتَ إِنْ لَمْ أَجِدْ إِلَّا مَنِيحَةً أُنْثَى أَفَأُضَحِّي بِهَا؟ قَالَ: لَا، وَلَكِنْ تَأْخُذُ مِنْ شَعْرِكَ، وَتُقَلِّمُ أَظْفَارَكَ، وَتَقُصُّ شَارِبَكَ، وَتَحْلِقُ عَانَتَكَ، فَذَلِكَ تَمَامُ أُضْحِيَّتِكَ عِنْدَ اللَّهِ عَزَّ وَجَلَّ.

অর্থ : আব্দুল্লাহ বিন আমর রা. থেকে বর্ণিত নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, আমাকে কুরবানীর দিবসে ঈদ (পালনের) আদেশ করা হয়েছে। যা আল্লাহ এ উম্মতের জন্য নির্ধারণ করেছেন। এক সাহাবী আরজ করলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! যদি আমার কাছে শুধু একটি মানিহা থাকে (অর্থাৎ অন্যের থেকে নেওয়া দুগ্ধ দানকারী উটনী) আমি কি তা কুরবানী করতে পারি? নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, না, তবে তুমি চুল, নখ ও মোঁচ কাটবে এবং নাভীর নিচের পশম পরিষ্কার করবে। এটাই আল্লাহর দরবারে তোমার পূর্ণ কুরবানী বলে গণ্য হবে। Ñসুনানে আবু দাউদ, হাদীস ২৭৮৯; সুনানে নাসায়ী, হাদীস ৪৩৬৫

এই হাদীসে যেহেতু কুরবানীর দিন চুল-নখ কাটার কথা আছে তাহলে এর আগে না কাটার দিকে ইঙ্গিত বুঝা যায়।

২.

ওলীদ বিন মুসলিম বলেন, আমি মুহাম্মাদ বিন আজলানকে যিলহজ্বের দশকে চুল কাটা সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলাম। তখন তিনি বললেন, আমাকে নাফে রাহ বলেছেন যে,

إن ابن عمر مر بامرأة تأخذ من شعر ابنها في الايام العشر فقال : لو أخرتيه إلى يوم النحر كان أحسن.

অর্থ : আব্দুল্লাহ ইবনে উমর এক নারীর নিকট দিয়ে অতিক্রম করছিলেন। মহিলাটি যিলহজ্বের দশকের ভেতর তার সন্তানের চুল কেটে দিচ্ছিল। তখন তিনি বললেন, যদি ঈদের দিন পর্যন্ত অপেক্ষা করতে তবে বড় ভাল হত। Ñমুস্তাদরাকে হাকেম, হাদীস ৭৫৯৫

৩.

এ সম্পর্কে আরেকটি বর্ণনা হল,

قال مسدد وحدثنا المعتمر بن سليمان التيمي سمعت أبي يقول : كان ابن سيرين يكره إذا دخل العشر أن يأخذ الرجل من شعره حتى يكره أن يحلق الصبيان في العشر.

মুতামির ইবনে সুলাইমান আততাইমী  বলেন, আমি আমার পিতাকে বলতে শুনেছি যে ইবনে সীরীন রাহ. যিলহজ্বের দশকে চুল কাটা অপছন্দ করতেন। এমনকি এই দশকে ছোট বাচ্চাদের মাথা মুÐণ করাকেও অপছন্দ করতেন। Ñআল মুহাল্লা, ইবনে হাযম ৬/২৮

এসব দলীলের কারণে কারো কারো মতে সকলের জন্যই যিলহজ্বের প্রথম দশকে নখ, গোফ ও চুল না-কাটা উত্তম। তবে এতে কোনো সন্দেহ নেই, এ বিধানটি কুরবানিদাতার জন্য তাকিদপূর্ণ, তার জন্য তা সুন্নত।

যিলহজ্বের প্রথম দশদিন বেশি বেশি ইবাদত ও যিকর করা

عَنْ ابْنِ عُمَرَ، عَنِ النَّبِيِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: ” مَا مِنْ أَيَّامٍ أَعْظَمُ عِنْدَ اللهِ وَلَا أَحَبُّ إِلَيْهِ الْعَمَلُ فِيهِنَّ مِنْ هَذِهِ الْأَيَّامِ الْعَشْرِ، فَأَكْثِرُوا فِيهِنَّ مِنَ التَّهْلِيلِ وَالتَّكْبِيرِ وَالتَّحْمِيدِ .

অর্থ : আব্দুল্লাহ ইবনে উমর রা. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, আল্লাহ তাআলার নিকট আশারায়ে যিলহজ্বের আমলের চেয়ে অধিক মহৎ এবং অধিক প্রিয় অন্য কোনো দিনের আমল নেই। সুতরাং তোমরা এই দিনগুলোতে বেশি বেশি লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ, আল্লাহু আকবার এবং আলহামদু লিল্লাহ পড়।’Ñমুসনাদে আহমদ ২/৫৭, হাদীস ৫৪৪৬; তবারানী কাবীর ১১/৬৮ হাদীস, ১১১১৬;মুসান্নাফে ইবনে আবী শাইবা, হাদীস ১৪১১০

যিলহজ্বের প্রথম নয় দিন রোযা রাখা

সুনানে আবু দাউদ ও মুসনাদে আহমাদের একটি বর্ণনায় এসেছে নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এই নয়টি দিবসে রোযা রাখতেন। -সুনানে আবু দাউদ, হাদীস ২৪৩৭; মুসনাদে আহমদ, হাদীস ২২২৩৪;সুনানে নাসাঈ, হাদীস ২৪১৬

এছাড়াও এ দিনগুলোর রোযা সম্পর্কে একাধিক বর্ণনা আছে। যেগুলোর প্রায় সবই জঈফ পর্যায়ের।  তবে সমষ্টিগত বিচারে তা আমলযোগ্য। অধিকাংশ ফকীহগণ এই নয় দিনে রোযা রাখা উত্তম বলেছেন।

নয় যিলহজ্ব রোযা রাখা মুস্তাহাব

عَنْ أَبِي قَتَادَةَ  قَالَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: صِيَامُ يَوْمِ عَرَفَةَ، أَحْتَسِبُ عَلَى اللهِ أَنْ يُكَفِّرَ السَّنَةَ الَّتِي قَبْلَهُ، وَالسَّنَةَ الَّتِي بَعْدَهُ.

অর্থাৎ, আবু কাতাদা রা. থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,ইয়াওমে আরাফার (নয় যিলহজ্ব) রোযার ব্যাপারে আমি আল্লাহর কাছে আশাবাদী, তিনি এর দ্বারা এর আগের এক বছরের এবং পরের এক বছরের গুনাহ মাফ করে দিবেন। Ñসহীহ মুসলিম, হাদীস ১১৬২; জামে তিরমিযী, হাদীস ৭৪৯; সুনানে আবু দাউদ, হাদীস ২৪২৫

প্রকাশ থাকে যে, উক্ত হাদীসে বর্ণিত ইয়াওমে আরাফা দ্বারা যিলহজ্বের নয় তারিখ উদ্দেশ্য। এই তারিখের পারিভাষিক  নাম হচ্ছে ইয়াওমে আরাফা। কেননা এই রোযা আরাফার ময়দানের আমল নয় বরং আরাফার দিন তো হাজ্বীদের জন্য রোযা না রাখাই মুস্তাহাব। যেমন হাদীস শরীফে এসেছে,

عَنْ أُمِّ الْفَضْلِ بِنْتِ الْحَارِثِ، ” أَنَّ نَاسًا تَمَارَوْا عِنْدَهَا يَوْمَ عَرَفَةَ، فِي صِيَامِ رَسُولِ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، فَقَالَ بَعْضُهُمْ: هُوَ صَائِمٌ، وَقَالَ بَعْضُهُمْ: لَيْسَ بِصَائِمٍ، فَأَرْسَلْتُ إِلَيْهِ بِقَدَحِ لَبَنٍ، وَهُوَ وَاقِفٌ عَلَى بَعِيرِهِ بِعَرَفَةَ، فَشَرِبَهُ “

উম্মুল ফযল বিনতে হারেছ বলেন, তার নিকট কতক লোক ইয়াওমে আরাফায় রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের রোযার ব্যাপারে সন্দেহ পোষণ করছিল। কেউ কেউ বলছিল তিনি রোযা আছেন। আর কেউ কেউ বলছিল তিনি রোযা নেই। উম্মুল ফযল একটি পেয়ালাতে দুধ পাঠালেন। নবীজী তখন উটের উপর ছিলেন। তিনি দুধ পান করলেন। -সহীহ মুসলিম, হাদীস ১১২৩

আরাফার দিন আল্লাহর রাসূল রোযা রাখেননি। একারণে ফিকহবিদগণ হাজ্বীদের জন্য আরাফার দিন রোযা না রাখা উত্তম বলেছেন। আবু কাতাদা রা. -এর উক্ত হাদীস দ্বারা ইয়াওমে আরাফায় রোযা রাখা মুস্তাহাব প্রমাণিত হয়। সুতরাং বুঝা গেল আবু কাতাদাহ রা.-এর হাদীসে ‘ইয়াওমে আরাফা’ দ্বারা নয় যিলহজ্ব অর্থাৎ ঈদের আগের দিনই উদ্দেশ্য। সুতরাং আমাদের দেশের চাঁদের হিসেবে যেদিন নয় তারিখ হয় সে দিনই ইয়াওমে আরাফা হিসেবে রোযা রাখা মুস্তাহাব হবে। সৌদীর হিসাবে আরাফার দিন অনুযায়ী নয়। উল্লেখ্য তাকবীরে তাশরীক সংক্রান্ত নিন্মোক্ত হাদীসেও ইয়াওমে আরাফা দ্বারা নয় যিলহজ্বই উদ্দেশ্য। কেননা এ আমল ও আরাফার সাথে নির্দিষ্ট কোনো আমল নয়। এ বিষয়ে বিস্তারিত জানার জন্য দেখুন মাসিক আলকাউসার জানুয়ারী ২০১৩ ঈ. (দুটি প্রশ্ন ও তার উত্তর)

তাকবীরে তাশরীক পড়া

আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন,

وَ اذْكُرُوا اللّٰهَ فِیْۤ اَیَّامٍ مَّعْدُوْدٰتٍ অর্থাৎ আর তোমরা আল্লাহকে স্মরণ কর (আইয়ামে তাশরীকের) নির্দিষ্ট দিনগুলোতে।’ Ñসূরা বাকারা (১) : ২০৩

একাধিক সাহাবা-তাবেয়ীন থেকে প্রমাণিত আছে যে, তারা নয় তারিখ আরাফার দিন ফজর থেকে তের তারিখ আসর পর্যন্ত তাকবীর পড়তেন। তন্মধ্যে হলেন, উমার ইবনুল খাত্তাব, আলী ইবনে আবি তালিব,আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা. যুহরী, মাকহুল, সুফিয়ান সাওরীসহ প্রমুখ সাহাবা-তাবেয়ীগণ।

তাকবীরে তাশরীকের জন্য বিভিন্ন শব্দ হাদীসে উল্লেখ হয়েছে। তন্মধ্যে সর্বোত্তম ও সর্বজনবিদিত পাঠ হল,

الله أكبر، الله أكبر، لا إله إلاالله والله أكبر، الله أكبر ولله الحمد.

মুসান্নাফ ইবনে আবী শাইবা, হাদীস ৫৬৯৬-৯৯; আল আওসাত, ইবনে মুনযির ৪/৩৪৯; এলাউস সুনান ৮/১৫৬; বাদায়েউস সানায়ে ১/৪৫৮

মাসআলা :

নয় যিলহজ্ব হতে তের যিলহজ্ব আছর পর্যন্ত মোট তেইশ ওয়াক্তের নামাযের পর একবার করে তাকবীরে তাশরীক বলা ওয়াজিব। জামাতে নামায পড়া হোক বা একাকি, পুরুষ বা নারী, মুকীম বা মুসাফির সকলের উপর ওয়াজিব।

মাসআলা :

প্রত্যেক ফরয নামাযের সালামের পর পরই কোনো কথাবার্তা বা নামায পরিপন্থী কোনো কাজ করার আগেই তাকবীরে তাশরীক পড়তে হবে। মাসআলা : তাকবীরে তাশরীক পুরুষের জন্য জোরে পড়া ওয়াজিব। আস্তে পড়লে তাকবীরে তাশরীক পড়ার হক আদায় হবে না। আর মহিলাগণ নিম্ন আওয়াজে অর্থাৎ নিজে শুনতে পায় এমন আওয়াজে পড়বে। Ñরদ্দুল মুহতার ২/১৭৮; এলাউস সুনান ৮/১৫২

মাসআলা :

শুধু পাঁচ ওয়াক্ত ফরযের পর তাকবীরে তাশরীক পড়তে হবে। বিতরের পর এবং অন্য কোনো সুন্নাত বা নফলের পরে পড়ার নিয়ম নেই।

মাসআলা :

ইমাম তাকবীর বলতে ভুলে গেলে মুক্তাদীগণ ইমামের জন্য অপেক্ষা না করে নিজেরা তাকবীর বলবেন।

মাসআলা :

নয় তারিখ থেকে ১৩ তারিখ আসর পর্যন্ত কোনো নামায কাযা হয়ে গেলে এবং ঐ কাযা এই দিনগুলোর ভিতরেই আদায় করলে সে কাযা নামাযের পরও তাকবীরে তাশরীক পড়বে।

মাসআলা :

হাজ্বীদের উপর ইহরাম অবস্থায় পূর্বোক্ত নিয়ম অনুযায়ী তাকবীরে তাশরীক পড়া ওয়াজিব।

তাকবীরে তাশরীক সংক্রান্ত মাসায়েলের জন্য দেখুন : রদ্দুল মুহতার ২/১৭৭-১৮০; ফাতওয়া হিন্দিয়া ১/১৫২; আল বাহরুর রায়েক ২/১৬৪-১৬৫, তাহতাবী আলাল মারাকী ২৯৪;

ঈদুল আযহার নামায

ঈদুল আযহার নামায প্রত্যেক সুস্থ মস্তিষ্কসম্পন্ন পুরুষের উপর ওয়াজিব। মেয়েদের উপর ওয়াজিব নয়। মেয়েরা ঈদের নামাযের জন্য ইদগাহে যাবে না। তেমনিভাবে নিজ গৃহে নিজেরা জামাত করেও পড়বে না।

عن نافع عن ابن عمر أنه كان لا يخرج نسائه في العيدين.

অর্থাৎ নাফে রাহ. বলেন, আব্দুল্লাহ ইবনে উমর রা. তাঁর নারীদেরকে দুই ঈদে ঈদগাহে যেতে দিতেন না।Ñআল আওসাত ৪/৩০১

অন্য বর্ণনায় এসেছে,

عن عروة عن أبيه أنه كان لا يدع امرأة من أهله تخرج إلى فطر ولا إلى أضحى.

উরওয়া তার পিতা (যুবাইর রা.) থেকে বর্ণনা করেন যে, তিনি নিজ পরিবারের নারীদেরকে ঈদুল ফিতর ও ইদুল আযহাতে যেতে দিতেন না। Ñ মুসান্নাফ ইবনে আবি শাইবা, হাদীস ৫৮৪৬

ইয়াহইয়া বিন সাঈদ আল আলআনসারী রাহ. (১৪৩ হি.) বলেন,

لا نعرف خروج المرأة الشابة عندنا في العيدين

অর্থাৎ, আমাদের সময়ে দুই ঈদের জন্য যুবতী নারীদের বের হওয়ার প্রচলন ছিল না। Ñআল আওসাত ৪/৩০২; উমদাতুল কারী ৩/৩০৫

ইবরাহীম নাখায়ী রাহ. বলেন,

يكره خروج النساء في العيدين.

উভয় ঈদে মহিলাদের (নামাযের জন্য) বাইরে যাওয়া মাকরূহ। Ñমুসান্নাফে ইবনে আবী শাইবা ৪/২৩৪

দেখুন : কিতাবুল হুজ্জাহ আলা আহলিল মাদীনা ১/২০১; কিতাবুল আছার ২৪৭; হেদায়া ১/১২৬; বাদায়েউস সানায়ে ১/৬১৭; আদ্দুররুল মুখতার ১/৫৬৬; মাসাইলুল ইমাম  আহমদ ১১৫; আল মুদাওওয়ানা ১/১৫৫;শরহুল মুহাযযাব ৫/১৩

ঈদের দিনের সুন্নতসমূহ

১.

মিসওয়াকসহ অযু করে উত্তমরূপে গোসল করা।

২.

নিজের উত্তম কাপড় পরা। ইবনে উমর রা. বলেন,নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াল্লাম দুই ঈদে উত্তম কাপড় পরতেন।

৩.

সুগন্ধি ব্যবহার করা।

৪.

কুরবানীর ঈদে নামাযের আগে কিছু না খাওয়া মুস্তাহাব। কোনো কোনো ফকীহের মতে, যে কুরবানী করবে না তার জন্যও ঈদের নামাযের আগে খানা থেকে বিরত থাকা মুস্তাহাব। হাদীস শরীফে এসেছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঈদুল ফিতরে কিছু না খেয়ে নামাযের জন্য বের হতেন না, আর কুরবানীর ঈদে নামাযের আগে কিছু খেতেন না। -জামে তিরমিযী ১/৭১, হাদীস ৫৪২;

শাবী রাহ. বলেন, সুন্নত হল, ঈদুল ফিতরের দিন নামাযে যাওয়ার আগে খাওয়া আর ঈদুল আযহার দিন নামায পর্যন্ত খাবারকে বিলম্বিত করা। -মুসান্নাফে ইবনে আবী শাইবা ৫৬৩৭

হযরত বুরাইদা রা. বলেন,

أن النبي صلى الله عليه وسلم كان لا يخرج يوم الفطر حتى يطعم وكان لا يأكل يوم النَّحْرِ شيأ حتى يرجع، فيأكل من أضحيته.

নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঈদুল ফিতরের জন্য না খেয়ে বের হতেন না। আর ঈদুল আযহাতে নামাযের থেকে ফিরে আসা পর্যন্ত কিছু খেতেন না। এরপর প্রথমে কুরবানীর গোস্ত খেতেন।Ñমুসনাদে আহমদ, হাদীস ২২৯৮; সুনানে দারাকুতনী ১/৪৫, হাদীস ১৭১৫; মেরকাত ৩/৪৯২; মাআরিফুস সুনান ৪/৪৫১; শরহে মুনয়া ৫৬৬; রদ্দুল মুহতার ২/১৭৬; ফাতওয়ায়ে হিন্দিয়া ১/২১১; বাদায়েউস সানায়ে ১/৬২৪

৫.

ওযর না থাকলে ঈদগাহে নামায পড়া। আবু সাঈদ রা. বলেন, নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঈদুল ফিতর এবং আযহাতে ইদগাহে যেতেন। -সহীহ বুখারী ১/১৩১

৬.

রাস্তায় উচ্চস্বরে তাকবীরে তাশরীক পড়া।

৭.

সম্ভব হলে এক রাস্তা দিয়ে যাওয়া এবং অন্য রাস্তা দিয়ে আসা। Ñসহীহ বুখারী, হাদীস ৯৮৬

মাসআলা : ঈদের নামাযের পূর্বে কোথাও কোনো ধরনের নফল নামায না পড়া এবং নামাযের পর ঈদগাহেও না পড়া। আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঈদুল ফিতরের দুই রাকাত নামায পড়েছেন, কিন্তু এর আগে বা পরে কোনো নামায পড়েননি। Ñসহীহ বুখারী, হাদীস ৯৬৪

কুরবানী করা

ঈদের নামাযের পর কুরবানী করা। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন,

فَصَلِّ لِرَبِّكَ وَ انْحَرْ.

অর্থাৎ আপনার রবের উদ্দেশ্যে নামায পড়–ন এবং কুরবানী করুন।

হাদীস শরীফে এসেছে,

خَطَبَنَا النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَوْمَ النَّحْرِ، قَالَ: إِنَّ أَوَّلَ مَا نَبْدَأُ بِهِ فِي يَوْمِنَا هَذَا أَنْ نُصَلِّيَ، ثُمَّ نَرْجِعَ، فَنَنْحَرَ فَمَنْ فَعَلَ ذَلِكَ فَقَدْ أَصَابَ سُنَّتَنَا، وَمَنْ ذَبَحَ قَبْلَ أَنْ يُصَلِّيَ، فَإِنَّمَا هُوَ لَحْمٌ عَجَّلَهُ لِأَهْلِهِ لَيْسَ مِنَ  النُّسُكِ فِي شَيْءٍ.

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের উদ্দেশ্যে খুৎবা দিলেন। তাতে বললেন, আমাদের এই দিবসে প্রথম কাজ (ঈদের) নামায আদায় করা এরপর কুরবানী করা। সুতরাং যে এভাবে করবে তার কাজ আমাদের তরীকা মত হবে। আর যে (ঈদের নামাযের) আগেই যবেহ করবে (তার কাজ তরীকা মত হবে না) তা পরিবারের জন্য প্রস্তুতকৃত সাধারণ গোস্ত হবে; কুরবানী নয়। Ñসহীহ বুখারী, হাদীস ৯৬৮; সহীহ মুসলিম,হাদীস ১৯৬০

হাদীসে এসেছে যে, কোনো ব্যক্তি ঈদের নামাযের আগে কুরবানী করেছিলেন, তখন নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদেরকে পুনরায় কুরবানী করার আদেশ দেন। Ñসহীহ বুখারী, হাদীস ৫৫০০; সহীহ মুসলিম, হাদীস ১৯৬০

নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যেভাবে কুরবানী করেছেন

ذَبَحَ النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَوْمَ الذَّبْحِ كَبْشَيْنِ أَقْرَنَيْنِ أَمْلَحَيْنِ مُوجَأَيْنِ، فَلَمَّا وَجَّهَهُمَا قَالَ: إِنِّي وَجَّهْتُ وَجْهِيَ لِلَّذِي فَطَرَ السَّمَوَاتِ وَالْأَرْضَ عَلَى مِلَّةِ إِبْرَاهِيمَ حَنِيفًا، وَمَا أَنَا مِنَ الْمُشْرِكِينَ، إِنَّ صَلَاتِي وَنُسُكِي وَمَحْيَايَ وَمَمَاتِي لِلَّهِ رَبِّ الْعَالَمِين.َ لَا شَرِيكَ لَهُ، وَبِذَلِكَ أُمِرْتُ وَأَنَا مِنَ الْمُسْلِمِينَ، اللَّهُمَّ مِنْكَ وَلَكَ، وَعَنْ مُحَمَّدٍ وَأُمَّتِهِ بِاسْمِ اللَّهِ، وَاللَّهُ أَكْبَرُ. ثُمَّ ذَبَحَ.

নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কুরবানীর দিন দুটি সাদা কালো বড় শিংবিশিষ্ট খাসিকৃত দুম্বা যবেহ করেছেন। যখন যবেহ করার জন্য শোয়ালেন, তখন বললেন,

إِنِّي وَجَّهْتُ وَجْهِيَ لِلَّذِي فَطَرَ السَّمَوَاتِ …

এরপর বিসমিল্লাহি আল্লাহু আকবার বলে যবাই করলেন। Ñমুসনাদে আহমদ , হাদীস ১৫০২২; সুনানে আবু দাউদ, হাদীস ৩৮৬; সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদীস ২২৫

হযরত শাদ্দাদ বিন আওস রা. থেকে বর্ণিত রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,

إِنَّ اللهَ كَتَبَ الْإِحْسَانَ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ، فَإِذَا قَتَلْتُمْ فَأَحْسِنُوا الْقِتْلَةَ، وَإِذَا ذَبَحْتُمْ فَأَحْسِنُوا الذَّبْحَ، وَلْيُحِدَّ أَحَدُكُمْ شَفْرَتَهُ، فَلْيُرِحْ ذَبِيحَتَهُ.

অর্থ : আল্লাহ তাআলা সব কিছু সুন্দরভাবে সম্পাদন করার নির্দেশ দিয়েছেন। সুতরাং তোমরা যখন হত্যা করবে তো সুন্দরভাবে হত্যা কর। যখন যবেহ করবে তখন উত্তমরূপে যবেহ কর। প্রত্যেকে যেন তার ছুরিতে শান দেয় এবং তার পশুকে শান্তি দেয়। Ñসহীহ মুসলিম, হাদীস ১৯৫৫; সুনানে আবু দাউদ, হাদীস ২৮১৫

সুতরাং পশু-কুরবানীর ক্ষেত্রে পশুর অতিরিক্ত কষ্ট না হয় সেদিকে লক্ষ্য রাখতে হবে। ছুরি ভালভাবে ধার করে নিতে হবে। পশু ঠাÐা হওয়ার আগে তার হাত পা কাটা কিংবা চামড়া ছেলা থেকে বিরত থাকতে হবে। তদ্রƒপ কেউ কেউ পশুকে যবহের অনেক আগে হাত পা বেঁধে ফেলে রাখে। এতে পশুর অতিরিক্ত কষ্ট হয়। তেমনি কোনো পশুর সামনে অন্য পশুকে যবেহ করবে না।

Print Friendly, PDF & Email

এটাও পড়ে দেখতে পারেন!

কুরবানী ও গোস্ত দানের নিয়ত একসাথে সম্ভব?

প্রশ্ন আসসালামু আলাইকুম.. আমি গত কয়েকদিন আগে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনার স্বীকার হই কিন্তু আল্লাহর রহমতে কয়েক …