হোম / আকিদা-বিশ্বাস / কাদিয়ানী সম্প্রদায় কেন কাফির? শেষ পর্ব

কাদিয়ানী সম্প্রদায় কেন কাফির? শেষ পর্ব

আল্লামা মনযূর নুমানী রহঃ

ভাষান্তরমাওলানা মাহমূদ হাসান মাসরূর

৭ম পর্ব

ঈসা মাসীহের জীবন ও অবতরণ সম্পর্কে কুরআনের সুস্পষ্ট দলিল

আল্লাহ তাআলা  সূরা নিসার উপরোক্ত ১৫৭ এবং ১৫৮ নং আয়াতের পরেই এক বিশেষ বর্ণনাভঙ্গিতে ঈসা আলাইহিস সালামের প্রলম্বিত জীবন, শেষ যামানায় তাঁর অবতরণ এবং পৃথিবীতে মৃত্যুবরণের কথা আলোচনা করেছেন। ইরশাদ হয়েছে, (তরজমা) প্রত্যেক আহলে কিতাব অবশ্যই ঈসা মাসীহের মৃত্যুর পূর্বে তাঁর প্রতি ঈমান আনবে। আর কেয়ামতের দিন তিনি তাদের বিষয়ে সাক্ষী হবেন। -সূরা নিসা ৪ : ১৫৯

অগ্র-পশ্চাতের বিবেচনায় আয়াতের অর্থ পাঠক ইতিমধ্যেই জেনেছেন, ইহুদীদের ঔদ্ধত্যপূর্ণ মিথ্যা দাবী হল, ‘তারা ঈসা মাসীহকে শূলিতে চড়িয়ে হত্যা করেছে এবং তিনি পাপপূর্ণ মৃত্যু আলিঙ্গনে বাধ্য হয়েছেন।’ আল্লাহ পাক সূরা নিসার ১৫৭ নম্বর আয়াতে ইহুদীদের উক্ত দাবী উল্লেখ করে একই আয়াতে তা রদও করে দিয়েছেন। ইরশাদ হয়েছে, (ইহুদীদের উক্ত দাবী সম্পূর্ণ মিথ্যা ও বানোয়াট) তারা মাসীহ ইবনে মারইয়ামকে হত্যা করতে পারেনি, শূলীতেও চড়াতে পারেনি; বরং এ-বিষয়ে তাদের বিভ্রম ঘটেছিল (তারা মাসীহ ভেবে অন্য এক বিশ্বাসঘাতক-গাদ্দারকে শূলীতে চড়িয়েছিল, যাকে আল্লাহ পাক ঈসা মাসীহের আকৃতিতে রূপান্তরিত করে দিয়েছিলেন)। প্রকৃতপক্ষে যারা এ বিষয়ে মতভেদ করছে তারা ঘোর সংশয়ে নিপতিত। এ-বিষয়ে অনুমানের অনুসরণ ছাড়া তাদের প্রকৃত কোনো জ্ঞান নেই। একিনী কথা হচ্ছে, তারা ঈসাকে হত্যা করেনি (হত্যা করেছে অন্য একজনকে)।-সূরা নিসা (৪) : ১৫৭-১৫৮

মূলত দুশমন ইহুদীরা তাঁকে ছুতেও পারেনি। আল্লাহ পাক পরের আয়াতে বলেছেন, বরং আল্লাহ পাক তাঁকে (বিশেষ কুদরতে ও কৌশলে অক্ষত অবস্থায়) নিজের নিকট উঠিয়ে নিয়েছেন।

এরপরেই আল্লাহ তাআলা আলোচ্য আয়াতটি ইরশাদ করেছেন,

وان من اهل الكتاب الا ليؤمنن به

‘‘প্রত্যেক আহলে কিতাব অবশ্যই ঈসা মাসীহের মৃত্যুর পূর্বে তাঁর প্রতি ঈমান আনবে।  (সূরা নিসা : ১৫৯)

এ আয়াতটি যেন ইহুদীদের মিথ্যা দাবী এবং খ্রিস্টানদের ভুল বিশ্বাসের কফিনে ঠুকে দেওয়া সর্বশেষ কীলক! আয়াতের সারকথা হল, ঈসা আলাইহিস সালামের শূলীবিদ্ধ হয়ে নিহত না হওয়া এবং অক্ষত অবস্থায় আকাশে উত্তোলিত হওয়ার যে বিশ্বাস কুরআন মাজীদে বর্ণনা করা হয়েছে, সেটা ইহুদী-খ্রিস্টানরাও মেনে নেবে। যখন ঈসা আলাইহিস সালামকে আবার পৃথিবীতে পাঠানো হবে এবং এখানেই তিনি স্বাভাবিক মৃত্যু বরণ করবেন, আর তারা বিষয়গুলো প্রত্যক্ষ করবে তখন তারা ঈসা আলাইহিস সালামের প্রতি হুবহু মুসলমানদের মতোই ঈমান আনবে! অর্থাৎ যে ইহুদীরা ঈসা মাসীহকে অস্বীকার করত, তাঁর সঙ্গে দুশমনি করত এবং তাঁকে জারজ সন্তান পর্যন্ত বলত, তারা তাদের এই ঘৃণ্য আকিদা ত্যাগ করে তাঁর প্রতি ঈমান আনবে, তাঁকে আল্লাহ পাকের একজন সম্মানিত বান্দা ও রাসূলরূপে মেনে নেবে। অনুরূপভাবে যে খ্রিস্টানরা ঈসা মাসীহকে খোদা, খোদার পুত্র এবং তিন খোদার এক খোদা বলে বিশ্বাস করত তারাও সরাসরি ঈসা আলাইহিস সালামের বাণী শ্রবণ করে সমস্ত শিরকী আকিদা পরিত্যাগ করবে এবং তাঁকে আল্লাহ পাকের একজন নৈকট্যধন্য বান্দা ও রাসূল বলে বিশ্বাস করবে। আর উভয় সম্প্রদায় স্ব স্ব ধর্ম-বিশ্বাস ত্যাগ করে ইসলামে দাখিল হয়ে যাবে। সে সময় ঈসা আলাইহিস সালামই হবেন দ্বীনে মুহাম্মাদীর প্রধান দাঈ ও পতাকাবাহী।  এরপর আল্লাহ পাক ইরশাদ করেন, অনন্তর ঈসা আলাইহিস সালাম তাঁর প্রতি ঈমান আনয়নকারী আহলে কিতাবের বিষয়ে কিয়ামতের দিন সাক্ষ্য দিবেন। (যেমনিভাবে অন্যান্য নবীগণও আপন আপন উম্মতের বিষয়ে সাক্ষ্য প্রদান করবেন)।-সূরা নিসা (৪) : ১৫৯

যাইহোক ঈসা আলাইহিস সালামের শূলীবিদ্ধ হয়ে নিহত না হওয়া এবং অক্ষত অবস্থায় আকাশে উত্তোলিত হওয়ার বিষয়ে আলোচ্য আয়াতটিকে পূর্ববর্তী আয়াতগুলির চূড়ান্ত ও সম্পূরক বক্তব্য হিসাবে আখ্যায়িত করা যায়। বর্ণনার ভঙ্গি, বক্তব্যের ধারাবাহিকতা, অগ্রপশ্চাৎ ও ব্যাকরণিক বিবেচনা ইত্যাদির নিরিখে আয়াতের উল্লেখিত তাফসীরই সহীহ। এ তাফসীর করা হয়েছে به এবং موتهএর জমির (সর্বনাম) দুটি ঈসা মাসীহের দিকে প্রত্যানীত ধরে। কারণ পূর্বের আয়াতগুলিতে তাঁরই আলোচনা এসেছে বারবার। ইবনে জারীর (৩১০ হি.) ও ইবনে কাসীর (৭৭৪ হি.) (তাফসীরের কিতাবসমূহের মাঝে যাদের কিতাব স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যের অধিকারী) উভয়ে আয়াতটির উপর তফসীলী আলোচনা করেছেন এবং বিভিন্ন বিবেচনায় আয়াতের উল্লিখিত তাফসীরকেই সহীহ ও রাজেহ (অধিক প্রাধান্যযোগ্য) বলে মত প্রকাশ করেছেন। দেখুন : তাফসীরে তাবারী ৭/৬৬৪, তাফসীরে ইবনে কাছীর ২/৪০৬

আয়াতের তাফসীরে সাহাবা ও মুফাসসিরীনে কেরামের বক্তব্য

সহীহ সূত্রে সাহাবায়ে কেরাম থেকেও এই তাফসীর বর্ণিত হয়েছে। হযরত আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত, রাসূলে পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহ ওয়াসাল্লাম কসম করে বলেছেন, ঐ সত্তার কসম, যাঁর হাতে আমার জীবন! নিশ্চয়ই আল্লাহর হুকুমে ঈসা ইবনে মারইয়াম (কেয়ামতের পূর্বে) ন্যায়বিচারক শাসকরূপে অবতরণ করবেন। তাঁর সময়কাল অত্যন্ত মঙ্গল ও বরকতময় হবে। হযরত আবু হুরায়রা রা. হাদীসটি বয়ান করার পর বলতেন, অর্থাৎ যদি তোমরা ঈসা মাসীহের অবতরণের বিষয়টি কুরআন থেকে জানতে চাও তবে এ আয়াত পড়, (তরজমা) ‘‘প্রত্যেক আহলে কিতাবই ঈসার মৃত্যুর পূর্বে তাঁর প্রতি ঈমান আনবে।’’

হাদীসটি ‘মুত্তাফাকুন আলাইহি’ অর্থাৎ একই সাহাবী থেকে ইমাম বুখারী (হাদীস নং ৩৪৪৮) এবং ইমাম মুসলিম (হাদীস নং ১৫৫) উভয়ে রেওয়ায়েত করেছেন। হাদীসের অন্যান্য কিতাবেও এ বর্ণনা রয়েছে। (দেখুন মুসনাদে আহমাদ, হাদীস ১০৪০৪; সুনানে আবু দাউদ হাদীস ৪৩২৫, জামে তিরমিযী হাদীস ২২৩৩ ইত্যাদি)

এ হাদীস থেকে পরিষ্কার বোঝা যায়, হযরত আবু হুরায়রা  রা. আয়াতের সেই তাফসীরই করেছেন যা ইতিপূর্বে আমরা উল্লেখ করেছি। আর এটাই স্বাভাবিক যে, তিনি এ তাফসীর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের তালীম ও তালকীন থেকেই গ্রহণ করেছেন। এখানে লক্ষণীয় বিষয় হল, হাদীসটির শেষে হযরত আবু হুরায়রা রা. যে আয়াত তেলাওয়াত করেছেন, সেটা যদি তিনি নবীজীর বক্তব্যের অংশ হিসাবে না বলে নিজে থেকে বলে থাকেন, তবে তা সাহাবী থেকে বর্ণিত তাফসীর। কিন্তু যদি আয়াতটিকে নবীজীর বক্তব্যের অংশ হিসাবে বলে থাকেন (দলিলের দৃষ্টিকোণ থেকে যা অধিক গ্রহণযোগ্য) তবে তো খোদ নবী আলাইহিস সালাম থেকেই আয়াতের উল্লিখিত তাফসীর প্রমাণিত ও সুনির্ধারিত হয়ে যায়! বিস্তারিত জানার জন্য দেখুন, কাশ্মিরী রাহ. (১৩৫২ হি.)-কৃত‘আকীদাতুল ইসলাম ফী হায়াতি ঈসা আলাইহিস সালাম।’ ২/২৪৮-২৭৪

আর আয়াতের অনুরূপ তাফসীর ইবনে আববাস রা. থেকেও বর্ণিত আছে। ইবনে জারীর তাবারী তাঁর তাফসীরে সনদসহ তা উল্লেখ করেছেন এবং হাফেজ ইবনে হাজার সনদটিকে সহীহ বলেছেন। তাঁর বক্তব্য হল,

وبهذا جزم ابن عباس فيما رواه ابن جرير من طريق سعيد

(অর্থ) ইবনে আববাসও মজবুতির সাথে আয়াতের সেই তাফসীর করেছেন যা হযরত আবু হুরায়রার রা.-এর রেওয়ায়েত থেকে বোঝা গেছে। ইবনে আববাসের রা. এ রেওয়ায়েত ইবনে জারীর তাবারী (৭/৬৬৪) সহীহ সনদে উল্লেখ করেছেন। -ফতহুল বারী ৬/৫৬৮

তাবেয়ীগণ থেকেও আলোচ্য আয়াতের এই তাফসীর বর্ণিত রয়েছে। হাসান বসরীসহ অন্যান্য তাবেয়ী থেকে ইবনে জারীর তাবারী সেগুলি সূত্রসহ উল্লেখ করেছেন। ইবনে জারীর তাফসীর সংকলনের ক্ষেত্রে যে নীতি এবং অভিরুচি অনুসরণ করেছেন সে হিসেবে তিনি তাঁর তাফসীরে আয়াতের আরও কয়েকটি তাফসীর উল্লেখ করেছেন। কিন্তু তিনি ‘রেওয়ায়েত ও দেরায়েত (বর্ণনা ও যুক্তি) এর আলোকে হযরত আবু হুরায়রা রা. ও ইবনে আববাস রা. থেকে বর্ণিত উপরোক্ত তাফসীরকেই সহীহ সাব্যস্ত করেছেন এবং আয়াতে উল্লেখিত به ও موته এর জমীর দুটি ঈসা মাসীহকে নির্দেশ করছে বলে দৃঢ় মত ব্যক্ত করেছেন।

ইবনে কাছীরও তাঁর তাফসীরে ইবনে জারীরের মতটি উল্লেখ করে অত্যন্ত মজবুত দলিলের মাধ্যমে তাঁর সহমত পোষণ করেছেন। তিনি লিখেছেন, অর্থাৎ ইবনে জারীর আয়াতের কয়েকটি তাফসীর উল্লেখ করার পর লিখেছেন, এগুলির মাঝে প্রথম তাফসীরই অধিক বিশুদ্ধ ও প্রাধান্যযোগ্য। প্রথম তাফসীরের অর্থ হল, শেষ যামানায় যখন ঈসা আলাইহিস সালামের অবতরণ হবে, তখন তাঁর ইন্তিকালের কিছুকাল আগে সমস্ত আহলে কিতাব তাঁর প্রতি ঈমান আনবে। আয়াতের এ তাফসীরটি এজন্য অধিক সহীহ ও প্রাধান্যযোগ্য যে, আগের আয়াতগুলিতে ইহুদীদের ঈসা মাসীহকে শূলীবিদ্ধ করে হত্যা করার এবং নাসারাদের তা মেনে নেওয়ার আকিদাকে আল্লাহ পাক রদ করে দিয়েছেন এবং বলেছেন, ঈসাকে তারা হত্যা করেনি, হত্যা করেছে তাঁর আকৃতিতে রূপান্তরিত অন্য এক ব্যক্তিকে। ঈসাকে তো আল্লাহ পাক অক্ষত অবস্থায় আসমানে তুলে নিয়েছেন। তিনি এখনো জীবিত আছেন। মুতাওয়াতির হাদীস থেকে প্রমাণিত, কেয়ামতের পূর্বক্ষণে তিনি পুনরায় অবতরণ করবেন। … ইবনে কাছীর আরও বলেন, সুতরাং কুরআনের আলোচ্য আয়াত আমাদেরকে জানাচ্ছে যে, শেষ যামানায় যখন তিনি অবতরণ করবেন, তখন ইহুদী-খ্রিস্টান উভয় দলই তাঁর প্রতি যথার্থরূপে ঈমান আনবে। কেউ তাঁর প্রতি ঈমান আনার বাকি থাকবে না। তাই আল্লাহ পাক বলেছেন, ‘সমস্ত আহলে কিতাব তাঁর (অর্থাৎ ঈসার) প্রতি ঈমান আনবে তাঁর (অর্থাৎ ঈসার) মৃত্যুর পূর্বে।’ যাঁর ব্যাপারে ইহুদী এবং তাঁদের কুমন্ত্রণা গ্রহণকারী খ্রিস্টানদের বিশ্বাস হল, তিনি শূলীবিদ্ধ হয়ে নিহত হয়েছেন। (তাদের এ বিশ্বাস খন্ডনের জন্যই আবার তাঁকে আল্লাহ পাক দুনিয়াতে পাঠাবেন)। -তাফসীরে ইবনে কাছীর ২/৪০৫-৪০৬

আমরা আমাদের এই সংক্ষিপ্ত বিবরণীতে শুধু ইবনে জারীর তাবারী ও ইবনে কাসীর দিমাশকীর বক্তব্য উল্লেখ করাই যথেষ্ট মনে করছি। কেননা তাফসীরের ক্ষেত্রে এ দুই ব্যক্তি এবং তাদের কিতাব স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যের অধিকারী। তাফসীরশাস্ত্র সম্পর্কে যাদের সামান্য অবগতি আছে তাদের কারো কাছে বিষয়টি অজানা নয়। উপরন্তু যে তাফসীরকে তারা প্রাধান্য দিয়েছেন তা সহীহ সূত্রে হযরত আবু হুরায়রা ও ইবনে আববাস থেকে বর্ণিত এবং অগ্রপশ্চাতের বিবেচনায় অধিক বোধগম্য। এ ছাড়া যে কয়টি তাফসীর বর্ণনা করা হয় সেগুলির কোনটি গ্রহণ করলে আয়াতগুলির পূর্বাপর বিন্যাস-সৌন্দর্য ক্ষুণ্ণ হয়। সেগুলি একরকম খাপছাড়া হয়ে পড়ে এবং বিশেষ অর্থময়তা হারিয়ে ফেলে। কোনো কোনো ছুরতে জমীরগুলি বিক্ষিপ্ত হয়ে পড়ে এবং জমীরগুলি এমন কিছুর দিকে ফিরাতে হয় কাছাকাছি কোথাও যার কোনো আলোচনা নেই।

যাইহোক, আয়াতের তাফসীরে অন্য যে কয়টি মত পাওয়া যায়, সেগুলি রেওয়ায়াত, দেরায়াত এবং আরবী ভাষারীতির দৃষ্টিকোণ থেকে নিঃসন্দেহে দুর্বল। কোনো কোনো মত একেবারেই অসংলগ্ন। কাশ্মিরী রাহ. তাঁর ‘আকীদাতুল ইসলাম ফী হায়াতি ঈসা আলাইহিস সালাম’নামক অনবদ্য কিতাবে আলোচ্য আয়াতের তাফসীরের উপর বিশ্লেষণমূলক লম্বা আলোচনা করেছেন। একপর্যায়ে তিনি আয়াতটির অন্যান্য তাফসীর সম্পর্কে বড় সুন্দর মন্তব্য করেছেন। তিনি বলেছেন, আলোচ্য আয়াতের উপরোক্ত তাফসীর ব্যতীত অন্য কোনো মত যদি তাফসীরের কিতাবগুলিতে না থাকত তাহলে যাদেরকে আল্লাহ পাক কুরআন বোঝার কিছু যওক দান করেছেন তাদের যেহেন সেগুলির দিকে মোটেই যেত না। ২/২৪৯

হায়াতে মাসীহ এবং নুযূলে মাসীহ সম্পর্কে যাদের মনে কিছু সংশয়-সন্দেহ রয়েছে এবং যারা মূল বিষয়টা বুঝে নিতে চান এই সংক্ষিপ্ত নিবন্ধ তাদের উদ্দেশ্যে লেখা। তাই আয়াতের তাফসীরে এর বেশি কিছু আরজ করতে চাই না। আল্লাহ চান তো বোঝার জন্য এটুকুই যথেষ্ট। অন্যথায় এ বিষয়ে অনেক অনেক তাফসীরের বরাত দিয়ে শত পৃষ্ঠার প্রবন্ধ লেখা অসম্ভব কিছু নয়।

তবে হ্যাঁ, আয়াতের তাফসীর সম্পর্কে উম্মতের সর্বজনবিদিত আলেম শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া রাহ.-এর কিছু বক্তব্য উল্লেখ করা মুনাসেব মনে করছি। খ্রিস্টধর্ম ও তার রদ সম্পর্কে লিখিত ‘আলজাওয়াবুস সহীহ লিমান বাদ্দালা দ্বীনাল মাসীহ’ তার সুপ্রসিদ্ধ ও জ্ঞানগর্ভ একটি কিতাব। সেখানে প্রসঙ্গক্রমে আলোচ্য আয়াতের তাফসীরের উপর তিনি তাঁর আদত অনুসারে দলিলসমৃদ্ধ দীর্ঘ আলোচনা করেছেন। সামান্য অংশ পাঠকের খেদমতে তুলে ধরছি। তিনি লিখেছেন, অতপর আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন,

وان من اهل الكتاب الا ليؤمنن به قبل موته

অধিকাংশ আলেমের মতে আয়াতের অর্থ হল, সমস্ত কিতাবীগণ ঈসা মাসীহের ইন্তিকালের পূর্বে তাঁর প্রতি ঈমান আনবে। -আল জাওয়াবুস সহীহ ২/২৮৩

এরপর ইবনে তাইমিয়া রাহ. আয়াতের তাফসীরে বর্ণিত অন্যান্য বক্তব্যগুলি উল্লেখ করেছেন এবং দলিলের মাধ্যমে সেগুলো দুর্বল কিংবা অশুদ্ধ প্রমাণ করেছেন। অবশেষে লিখেছেন, সুতরাং এই আলোচনা থেকে স্পষ্ট হয়ে গেল, ঈসা মাসীহের ইন্তিকালের পূর্বে সমস্ত আহলে কিতাব-ইহুদী এবং খ্রিস্টান তাঁর প্রতি ঈমান আনবে। আর তা হবে সে সময় যখন তিনি দুনিয়াতে অবতরণ করবেন। ইহুদী-খ্রিস্টান উভয় জাতি ঈসা আলাইহিস সালামকে সত্য রাসূলরূপে বিশ্বাস করবে। কেউ তাকে‘মিথ্যা নবী’ ভাববে না যেমনটা ইহুদীরা ভেবে থাকে এবং কেউ তাঁকে খোদাও মনে করবে না, খ্রিস্টানরা মনে করে। -আল জাওয়াবুস সহীহ ২/২৮৪

এরপর ইবনে তাইমিয়া রাহ. এ বিষয়ে আলোকপাত করেছেন যে, আয়াতে আহলে কিতাব বলতে ঐ সমস্ত লোক উদ্দেশ্য যারা নুযূলে মাসীহের পর তাঁর ইন্তিকালের পূর্বে বিদ্যমান থাকবে। তারা সবাই মাসীহ আলাইহিস সালামের ইন্তিকালের পূর্বে তাঁর প্রতি ঈমান আনবে। এরপর তিনি লিখেছেন, সেই সময় তাঁর প্রতি আহলে কিতাবগণের ঈমান আনার কারণও পরিষ্কার। এর মাধ্যমে সবার সামনে দিবালোকের ন্যায় স্পষ্ট হবে যে, ঈসা আলাইহিস সালাম আল্লাহ পাকের মুজিযাপ্রাপ্ত রাসূল ছিলেন, নবুওতের মিথ্যা দাবীদার ছিলেন না। কিংবা তিনি খোদাও ছিলেন না। সুতরাং আল্লাহ তাআলা এই আয়াতে ঈসা মাসীহের অবতরণের পর তাঁর প্রতি আহলে কিতাবের ঈমান আনার কথা আলোচনা করেছেন।-আল জাওয়াবুস সহীহ ২/২৮৪

অন্য জায়গায় ইবনে তাইমিয়া রাহ. সহীহ বুখারী ও মুসলিমে উল্লেখিত হযরত আবু হুরায়রার রা.-এর রেওয়ায়েত এবং এতদসংশ্লিষ্ট আরও কিছু হাদীস উল্লেখের পর লিখেছেন, (উল্লেখিত হাদীসগুলিতে ঈসা মাসীহের আগমনের যে সংবাদ দেওয়া হয়েছে) তা আল্লাহ পাকের বাণী-

وان من اهل الكتاب الا ليؤمنن به قبل موته

-এর তাফসীর। অর্থাৎ যখন ঈসা মাসীহ দুনিয়াতে অবতরণ করবেন তখন তাঁর ওফাতের পূর্বে সমস্ত আহলে কিতাব তাঁর প্রতি ঈমান আনবে। তখন আর কেউ ইহুদী বা খ্রিস্টান হিসাবে বাকী থাকবে না। ইসলাম ব্যতীত অন্য কোনো ধর্মই আর থাকবে না। -আল জাওয়াবুস সহীহ ৩/৩২৫

শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া রাহ.-এর বক্তব্যগুলোতে একটি কথা বারবার এসেছে যে, সহীহ হাদীস মোতাবেক শেষ যামানায় ঈসা আলাইহিস সালাম অবতরণ করবেন এবং পৃথিবীতেই মৃত্যুবরণ করবেন। আর ইবনে তাইমিয়ার মতে কুরআন মাজীদের আয়াত

وان من اهل الكتاب الا ليؤمنن به قبل موته

-এর এটাই সহীহ তাফসীর।

এখানে বিশেষভাবে ইবনে তাইমিয়া রাহ.-এর বক্তব্যগুলো আমরা এজন্য তুলে ধরেছি যে, আজকালের সুশীলরাও তাঁর বিস্ময়কর পান্ডিত্য, কুরআন-হাদীস বোঝার ক্ষেত্রে তাঁর বিরল প্রতিভা ও পারঙ্গমতা এবং ইসলামী ইতিহাসে তাঁর সুবিশাল খেদমত ও অবদানের কথা অকপটে স্বীকার করে থাকেন। খোদ মির্জা কাদিয়ানীও তার বিভিন্ন রচনায় ইবনে তাইমিয়াকে তাঁর সময়ের ‘ইমাম’ ও‘মুজতাহিদ’ বলে উল্লেখ করেছেন। সাথে সাথে ইবনে তাইমিয়া হায়াতে মাসীহ অস্বীকার করতেন এবং ওফাতে মাসীহের প্রবক্তা ছিলেন বলেও নির্জলা মিথ্যাচার করেছেন। মির্জা কাদিয়ানী এবং তার অনুসারীরা এ জাতীয় মিথ্যাচারে কতটা বেবাক ও দুঃসাহসী আল জাওয়াবুস সহীহ -এর উদ্ধৃতিগুলো পাঠ করে যে কেউ ধরে ফেলতে পারেন।

তো এই হল শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়ার একটি মাত্র কিতাবের অল্প কয়েকটি উদ্ধৃতি। কেউ চাইলে এক ইবনে তাইমিয়ারই অন্যান্য কিতাব থেকে শত উদ্ধৃতি তুলে ধরতে পারেন। পাঠকের কাছে ক্ষমা চাইছি, অনিচ্ছা সত্ত্বেও আয়াতটির তাফসীর প্রলম্বিত হয়ে গেল। সর্বশেষ শাহ ওয়ালি উল্লাহ কৃত আয়াতের একটি ফার্সি তরজমা উল্লেখ করে আলোচনার ইতি টানছি। শাহ ওয়ালি উল্লাহ (১১৭৬ হি.) বার শতকের একজন স্বীকৃত মুজাদ্দিদ। তিনি আলোচ্য আয়াতের তরজমায় লিখেছেন, অর্থাৎ আহলে কিতাবের প্রত্যেকে অবশ্যই ঈসা আলাইহিস সালামের ওফাতের পূর্বে তাঁর উপর ঈমান আনবে। আর তিনি কেয়ামতের দিন তাদের বিষয়ে সাক্ষ্য দেবেন। -ফতহুর রহমান

শাহ ওয়ালি উল্লাহর উপরোক্ত তরজমা থেকে বোঝা যায়, তাঁর নিকটও আয়াতের ঐ তাফসীর গ্রহণযোগ্য যা হযরত ইবনে আববাস রা. ও আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত। আর আগেই উল্লেখ করা হয়েছে, ইবনে জারীর তাবারী, ইবনে কাসীর দিমাশকী ও ইবনে তাইমিয়া হাররানী প্রমুখ ইমামগণ দলিলের আলোকে  এ তাফসীরকেই সহীহ ও প্রাধান্যযোগ্য স্থির করেছেন। অতএব সূরা নিসার ১৫৯ নম্বর আয়াতটি হায়াতে মাসীহ এবং নুযূলে মাসীহ -এর স্পষ্টতম দলিল।

শাহ ওয়ালি উল্লাহ-এর তরজমাও বিশেষভাবে উল্লেখ করার কারণ, তাঁর ব্যক্তিত্বও সকল ঘরানার নিকট স্বীকৃত। হাল যামানার যে সমস্ত সুধীজন হায়াতে মাসীহ ও নুযূলে মাসীহের মতো বিষয়ে দ্বিধা পোষণ করেন এবং এ ক্ষেত্রে যারা কাদিয়ানীদের কুমন্ত্রণা সহজেই গিলে ফেলেন, তারাও শাহ ওয়ালি উল্লাহ-এর অবদান স্বীকার করে থাকেন। এমনকি মির্জা কাদিয়ানীও তাঁকে দ্বীনী বিষয়ে ‘দলিল’ মনে করেন এবং হিজরী বার শতকের মুজাদ্দিদরূপে মান্য করেন।

হায়াতে মাসীহ ও নুযূলে মাসীহ সম্পর্কে আরেকটি স্পষ্ট আয়াত

কুরআন মাজীদের সূরা যুখরুফে প্রথমে মূসা আলাইহিস সালামের আলোচনা করা হয়েছে। এরপর করা হয়েছে ঈসা আলাইহিস সালামের আলোচনা। একপর্যায়ে বলা হয়েছে,

وَإِنَّهُ لَعِلْمٌ لِلسَّاعَةِ فَلَا تَمْتَرُنَّ بِهَا

অর্থাৎ নিশ্চয়ই তিনি (ঈসা মাসীহ) কিয়ামতের একটি আলামত। সুতরাং তোমরা তাঁর ব্যাপারে কোনো সন্দেহ করো না।-সূরা যুখরূফ ৪৩ : ৬১

এ আয়াতে ঈসা আলাইহিস সালামকে কেয়ামতের আলামত বলা হয়েছে। এর অর্থ এটাই যে, কিয়ামতের পূর্বক্ষণে তাঁর অবতরণ অত্যাসন্ন হওয়া কিয়ামতের বিশেষ একটি নিদর্শন।

সহীহ মুসলিমে এসেছে, হযরত হুযায়ফা বিন উসাইদ গিফারী রা. থেকে বর্ণিত, একবার নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের সামনে কিয়ামতের দশটি গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন বয়ান করেন। এ-প্রসঙ্গে দাজ্জালের আবির্ভাব ও ‘দা-ববাতুল আর্দ’ বের হওয়ার সংবাদ দেন। আরও বলেন,

ونزول عيسى بن مريم

অর্থাৎ ঈসা ইবনে মারইয়ামের অবতরণ। সহীহ মুসলিম, হাদীস ২৯০১

তো সহীহ মুসলিমের এ হাদীস এবং এ জাতীয় অন্যান্য হাদীসকে, যেগুলিতে কেয়ামতের আলামতরূপে নুযূলে মাসীহের কথা বলা হয়েছে, আলোচ্য আয়াতের তাফসীর গণ্য করা যায়। এই তাফসীরের ভিত্তি হল, এর যমীর (সর্বনাম) ঈসা মাসীহকে বোঝাবে। কারণ পূর্ব থেকে তাঁরই আলোচনা চলছে এবং সমস্ত যমীর (সর্বনাম) তাঁকেই নির্দেশ করছে। আর সাহাবায়ে কেরামও আয়াতের এ তাফসীর বুঝেছেন এবং বর্ণনা করেছেন।

ইবনে আববাস রা. থেকে বর্ণিত,

هو خروج عيسى بن  مريم قبل يوم القيامة

তিনি আয়াতের তাফসীরে বলেছেন, অর্থাৎ আয়াতে বর্ণিত আলামত হল কেয়ামতের পূর্বক্ষণে ঈসা ইবনে মারইয়ামের আবির্ভাব। -মুসনাদে আহমদ, হাদীস ২৯১৮।

পূর্ণ হাদীসটি ইবনে কাছীর তাঁর তাফসীরেও উল্লেখ করেছেন। (তাফসীর ইবনে কাছীর ৭/২২১)

অনুরূপ তাফসীর হযরত আবু হুরায়রা রা. থেকেও বর্ণিত। (দেখুন আদ্ দুররুল মানছূর ৬/২০)

তাফসীরের কিতাবসমূহ যাদের মুতালাআ করার সুযোগ হয়, তারা জানেন, অধিকাংশ আয়াতের তাফসীরে একাধিক কওল ও মত বর্ণিত থাকে। এর কোনোটা সহীহ আর কোনোটা ভুল এমনকি সম্পূর্ণ অপ্রাসঙ্গিকও হয়ে থাকে। তেমনি আলোচ্য আয়াতের তাফসীরেও একাধিক কওল রয়েছে। হাফেজ ইবনে কাছীর তাঁর নিয়ম অনুসারে সেই কওলগুলো উল্লেখ করেছেন এবং সেগুলিকে অশুদ্ধ আখ্যায়িত করে লিখেছেন,  সহীহ মত হলো, وانه এর যমীরটি ঈসা মাসীহের দিকে ফিরবে, পূর্ব থেকেই যার আলোচনা চলে আসছে। আর তিনি কেয়ামতের একটি আলামত হওয়ার অর্থ কিয়ামতের পূর্বে তাঁর অবতরণ। যেমনটা আল্লাহ পাক অন্যত্র বলেছেন, তাঁর অর্থাৎ ঈসার মৃত্যুর পূর্বে সমস্ত আহলে কিতাব তাঁর প্রতি ঈমান আনবে।-তাফসীরে ইবনে কাছীর ৭/২২২

ইবনে কাছীরের বক্তব্যে এ দিকেও ইঙ্গিত রয়েছে যে, সূরা যুখরুফের আলোচ্য (৬১ নং) আয়াত এবং ইতিপূর্বে উল্লিখিত সূরা নিসার (১৫৯ নং) আয়াত একটি অপরটির তাফসীর। উভয় আয়াতে কেয়ামতের পূর্বে হযরত ঈসা আলাইহিস সালামের অবতরনের সংবাদ দেয়া হয়েছে। ইবনে কাছীর চলমান আয়াতের বিষয়ে লিখেছেন, এ থেকেও উল্লিখিত তাফসীরের সমর্থন মিলে যে, এ আয়াতের (প্রসিদ্ধ কেরাত অনুযায়ী -এর ‘আইনের নিচে যেরের পরিবর্তে ‘আইনের উপর যবর যোগে পড়ার) আরেকটি কেরাত বা পঠন-পদ্ধতি রয়েছে। আর তদোনুসারেও আয়াতের অর্থ কিয়ামত সংঘঠিত হওয়ার আলামত বা নিদর্শন।

প্রসিদ্ধ তাবেয়ী মুজাহিদ রাহ. বলেন,

وإنه لعلم للساعة

অর্থ হল, কিয়ামতের পূর্বে ঈসা ইবনে মারইয়ামের আবির্ভাব কিয়ামতের একটি বিশেষ নিদর্শন। আর হযরত আবু হুরায়রা রা., ইবনে আববাস রা., আবুল আ’লিয়া, আবু মালেক, ইকরিমা, হাসান বসরী, কাতাদাহ প্রমুখ সাহাবী ও তাবেঈসহ অন্যান্য বহু ইমাম থেকে অনুরূপ তাফসীর বর্ণিত হয়েছে। অন্য দিকে নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে তাওয়াতুরের সঙ্গে এ-মর্মে হাদীস বর্ণিত হয়েছে যে, কেয়ামতের পূর্বে ইনসাফগার খলিফা ও ন্যায়বান শাসকরূপে হযরত ঈসা আলাইহিস সালামের অবতরণ হবে। -তাফসীরে ইবনে কাছীর ৭/২২৩

এ আয়াতের তাফসীরেও আমরা কেবল ইবনে কাছীর রাহ.-এর তাফসীর উল্লেখ করে ক্ষান্ত হচ্ছি। কারণ তিনি তাঁর তাফসীরে সবগুলি দিকের উপর দলিলসমৃদ্ধ আলোচনা করেছেন। তাছাড়া নবীজী ও সাহাবায়ে কেরাম থেকে আয়াতের তাফসীর এসে গেলে বাড়তি কিছু বলার প্রয়োজন অবশিষ্ট থাকে না। অন্যথায় তাফসীরের নির্ভরযোগ্য প্রায় সকল কিতাবে আয়াতের এ-তাফসীরই করা হয়েছে।

শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া রাহ.-এর কিছু বক্তব্য আমরা ইতিপূর্বে উল্লেখ করেছি। সেখানে তিনি সূরা নিসার ১৫৯ নম্বর আয়াত সম্পর্কে বলেছেন, এতে কিয়ামতের পূর্বে ঈসা মাসীহের আগমন এবং ওফাতের পূর্বেই তাঁর প্রতি সমস্ত আহলে কিতাবের ঈমান আনার সংবাদ দেওয়া হয়েছে। তিনি তাঁর এ-বক্তব্যের স্বপক্ষে দলিলরূপে একাধিকবার আলোচ্য আয়াতখানি উল্লেখ করেছেন। তাঁর নিকট সূরা যুখরুফের এই আয়াতটি যেন নুযূলে ঈসার বিষয়ে সূরা নিসার ১৫৯ নম্বর থেকেও অধিক স্পষ্ট। যেমন তিনি লিখেছেন, কিন্তু মুসলমানরা বিশ্বাস করে, ঈসা ইবনে মারয়াম কিয়ামতের পূর্বে অবতরণ করবেন। … আর তখন সমস্ত ইহুদী নাসারা তাঁর প্রতি ঈমান আনবে, যেমনটা সূরা নিসার

وَإِنْ مِنْ أَهْلِ الْكِتَابِ إِلَّا لَيُؤْمِنَنَّ بِهِ قَبْلَ مَوْتِهِ

শীর্ষক ১৫৯ নম্বর আয়াতে আল্লাহ পাক বলেছেন। আয়াতটির সহীহ তাফসীর সম্পর্কে জমহুর (অধিকাংশ) আলেমের মত হল, আয়াতে উল্লিখিত قبل موته (তাঁর মৃত্যুর পূর্বে) দ্বারা قبل موت عيسى(ঈসার মৃত্যুর পূর্বে) উদ্দেশ্য। কেননা আল্লাহ তাআলা অন্যত্র বলেছেন, তিনি (মসীহ ইবনে মারয়াম) কিয়ামতের একটি নিদর্শন। তাঁর ব্যাপারে সন্দেহ করো না। -আলজাওয়াবুস সহীহ ১/৩২৮

আরেক জায়গায় ইবনে তাইমিয়া রাহ. লিখেছেন, কেয়ামতের পূর্বে মাসীহ ইবনে মারয়াম পৃথিবীতে অবতরণ করবেন। আল্লাহ তাআলা (সূরা নিসার ১৫৯ নম্বর আয়াতে) সংবাদ দিয়েছেন যে, তাঁর ইন্তেকালের পূর্বে আহলে কিতাবগণ তাঁর প্রতি ঈমান আসবে। অন্য আয়াতে যেমনটা আল্লাহ পাক বলেছেন, অর্থাৎ ঈসা ইবনে মারয়াম (আল্লাহর) একজন বান্দামাত্র, যাঁকে আমি কিছু নেয়ামত দান করেছি….. আর তিনি নিঃসন্দেহে কিয়ামতের একটি বিশেষ নিদর্শন।-আল জাওয়াবুস সহীহ ২/১৯৫

আর শাহ ওয়ালিউল্লাহ রাহ. আলোচ্য আয়াতের তরজমায় লিখেছেন,

وہر آئينہ عيسى نشانى ہست قيامت را

আবারও আরজ করছি, আয়াত দুটি সম্পর্কে আমরা বিশেষভাবে কেবল ইবনে তাইমিয়া এবং শাহ ওয়ালিউল্লাহর বক্তব্য উল্লেখ করেছি। কারণ আজকালের কথিত সুশীল শ্রেণীর নিকটও এ-দুই ব্যক্তির মহত্ব শুধু স্বীকৃতই নয়, তারা তারা তাঁদেরকে স্ব স্ব যামানার মুজাদ্দিদ এবং ইসলামের ভেদ ও রহস্য-জ্ঞানের সবচে’ বড় ধারক বলে মনে করে। অন্যথায় হায়াতে মাসীহ এবং নুযূলে মাসীহের উপর পূর্ববর্তী ও পরবর্তী আলেমগণের শত নয়, হাজারো উদ্ধৃতি পেশ করা সম্ভব। যারা এ বিষয়ে তাফসীর-গ্রন্থ রচনা করেছেন, তাঁরা তা করেছেনও।

উম্মতের ইজমা : শেষ কথা ও সারকথা

আমরা আলোচ্য নিবন্ধের শুরুতে আরজ করেছিলাম, মুসলমানদের হায়াতে মাসীহ এবং নুযূলে মাসীহের আকিদাদ্বয় দু’টি বুনিয়াদের উপর প্রতিষ্ঠিত। কুরআন মাজীদের কিছু আয়াত এবং বহু সংখ্যক হাদীস, যেগুলো সামগ্রিকভাবে এবং মর্মগত দিক থেকে তাওয়াতুরের
স্তরে উন্নীত।

তো পিছনের পৃষ্ঠাগুলোতে পাঠকের খেদমতে যা কিছু পেশ করা হয়েছে, তা পাঠ করলে কোনো সত্যসন্ধানী ন্যায়নিষ্ঠ ব্যক্তির অন্তরে ঈসা আলাইহিস সালাম নিহত না হওয়া এবং শূলীবিদ্ধ না-হওয়ার বিষয়ে কোনো সংশয় থাকার কথা নয়। কুরআন মাজীদের আয়াত এবং মুতাওয়াতির হাদীস দ্বারা এ বাস্তবতা সুপ্রতিষ্ঠিত। বরং আল্লাহ তাআলা ঈসা মাসীহকে সহি সালামতে উঠিয়ে নিয়েছেন আর তিনি জীবিত আছেন। কেয়ামতের পূর্বে দুনিয়াতে তাঁর অবতরণ হবে এবং তিনি এখানেই মৃত্যুবরণ করবেন। ঐ যমানার সমস্ত আহলে কিতাব তাঁর প্রতি যথাযথভাবে ঈমান আনবে।

কুরআন ও হাদীসের আলোকে বিষযটির আলোচনার পর এটুকু কথা আরও যুক্ত করছি যে, এই আকিদার উপর উম্মতের ইজমাও রয়েছে। হাদীস, তাফসীর, সীরাত-তারীখ, আকিদা ও কালাম ইত্যাদি ধর্মীয় বিভিন্ন শাস্ত্র সম্পর্কে যার কিছু অবগতি আছে, এটা তাঁর কাছে স্পষ্ট। উম্মতের আলেমগণ তাঁদের কিতাবে ইজমার কথা পরিষ্কার ভাষায় উল্লেখও করেছেন।

ইমাম আবুল হাছান আশআরী লিখেছেন, আল্লাহ তাআলা ঈসা আলাইহিস সালামকে আসমানে তুলে নিয়েছেন। এ বিষয়ের উপর উম্মতের ইজমা রয়েছে।-আল ইবানাহ ১/১১৫

আবু হাইয়ান আন্দালুসী ইবনে আতিয়্যা থেকে বর্ণনা করেন,  মুতাওয়াতির হাদীস দ্বারা প্রমাণিত এ বিষয়টির উপর উম্মতের ইজমা রয়েছে যে, ঈসা আলাইহিস সালাম আসমানে জীবিত অবস্থায় আছেন এবং তিনি শেষ যামানায় অবতরণ করবেন। -আল বাহরুল মুহীত ১২/২২২

সাহাবী ও আকাবিরে উম্মতের উপর কাদিয়ানীদের মিথ্যাচার

আমাদের জানামতে মির্জা কাদিয়ানী এবং তাঁর অনুসারী লেখকরা উম্মতের একাধিক আকাবির-মণিষীর ব্যাপারে দাবী করেছে, তাঁরা হায়াতে মাসীহ ও নুযূলে মাসীহ অস্বীকার করতেন। তাঁদের মাঝে ইবনে আববাস রা., ইবনে তাইমিয়া রাহ. এবং শাহ ওয়ালিউল্লাহ রাহ.-ও রয়েছেন। প্রবন্ধকারের পক্ষ হতে পূর্ণ আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে ঘোষণা করা হচ্ছে যে, কাদিয়ানীদের এ-দাবি শতভাগ মিথ্যা এবং এটা তাদের নির্লজ্জ মিথ্যাচারের পরিষ্কার দলিল। এ বিষয়ে ইবনে আববাস রা., ইবনে তাইমিয়া রাহ. এবং শাহ ওয়ালি উল্লাহর রাহ. সুস্পষ্ট বক্তব্য আমরা ইতিপূর্বে উল্লেখ করেছি। কাদিয়ানীরা আরও যাদের ব্যাপারে উপরোক্ত দাবী করেছে, সেগুলিও স্পষ্ট-নির্জলা মিথ্যা ছাড়া কিছুই নয়। ‘কাদিয়ানী চরিত্রের’ উপর যে সমস্ত আলেম বৃহৎ কলেবরের কিতাব লিখেছেন, তারা এ বিষয়গুলো প্রমাণ করে কাদিয়ানীদের স্বরূপ উন্মোচন করে দিয়েছেন। পাঠক ইচ্ছা করলে মাওলানা আব্দুল গণী লিখিত ‘হেদায়াতুল মুমতারী’ নামক মাত্র একটি কিতাবই মুতালাআ করে দেখতে পারেন।

যাই হোক, নবীজী ও সাহাবায়ে কেরামের সোনালী যুগ থেকে আজ পর্যন্ত সকল আকাবির-মনিষী, মুহাদ্দিস-মুফাসসির, ফকীহ-মুতাকাল্লিম ওলী-দরবেশ সবার এ বিষয়ে ইজমা রয়েছে যে, কুরআনের ভাষ্য অনুযায়ী ঈসা আলাহিস সালামকে হত্যাও করা হয়নি, শূ‎লীতেও দেওয়া হয়নি। বরং আল্লাহ পাক তাঁকে বিশেষ কুদরতে অক্ষত অবস্থায় শত্রুর হাত থেকে উদ্ধার করে আসমানে তুলে নিয়েছেন। তিনি আল্লাহ পাকের হুকুমে অলৌকিকভাবে জীবিত আছেন। কিয়ামতের পূর্বে পুনরায় অবতরণ করবেন আর এখানেই তাঁর মৃত্যু হবে। কুরআন-হাদীসের মাধ্যমে কোনো বিষয়ের উপর যখন এজাতীয় ইজমা প্রতিষ্ঠিত হয়ে যায় তখন তাঁর ব্যাপারে কোনো ঈমানদারের সংশয় প্রকাশ করা কিংবা ভিন্ন ব্যাখ্যা দেয়ার সুযোগ নেই। বরং এ জাতীয় বিষয়ে ভিন্ন ব্যাখ্যা বা তাবীলের আশ্রয় নেওয়া নিকৃষ্টতম গোমরাহি। আল্লাহ পাক সকলকে বোঝার তাওফীক দান করুন।

Print Friendly, PDF & Email

এটাও পড়ে দেখতে পারেন!

মুসলমানদের খায়বার আক্রমণ ছিল অমানবিক?

প্রশ্ন জনৈক নাস্তিকের অভিযোগ, হাদীসে এসেছে, খায়বারে সকাল বেলা সেখানকার বাসিন্দারা কাজে মগ্ন থাকা অবস্থায় …