হোম / আহলে হাদীস / মাযহাবী মতবিরোধের কারণে আব্বাসী খিলাফত ধ্বংস হয়েছিল?

মাযহাবী মতবিরোধের কারণে আব্বাসী খিলাফত ধ্বংস হয়েছিল?

প্রশ্ন

আসসালামু আলাইকুম। আশা করি আল্লাহর রমহাতে ভাল আছেন। আপনাদের মেহনতে আমাদের অনেক উপকার হচ্ছে আলহামদুলিল্লাহ। ইন্টারনেটে যেভাবে ভ্রান্ত মতাদর্শীরা তাদের মতবাদ ছড়াচ্ছিল, সেসময় আপনাদের আহলে হক মিডিয়ার লিখনী, ভিডিও আমাদের দ্বীন ও ঈমান রক্ষায় বড় অবদান রাখছে। মন থেকে আপনাদের জন্য দুআ রইল।

মুহতারাম মুফতী সাহেবের কাছে আমার আজকের প্রশ্ন হল, কিছুদিন পূর্বে আমার এক বন্ধু আহলে হাদীস ভাইদের লিখিত কয়েকটি বই দিল। সেগুলো মাযহাব বিষয়ে লিখিত। সেসব বইয়ের একটি বিষয় আমাকে খুবই ভাবিয়ে তুলেছে। বিষয়টি হল, হানাফী ও শাফেয়ী মাযহাবের অনুসারীদের বিবাদের কারণেই নাকি তাতারীরা আব্বাসী খিলাফতে হামলা করেছিল। এবং ইসলামী খিলাফত ধ্বংস করেছিল?

মাযহাবী বিবাদের কারণেই নাকি ইসলামী খিলাফত ধ্বংস হয়েছে। তাই মাযহাবের মাধ্যমে বিভক্ত হওয়া খুবই জঘন্য বিষয়।

এ বিষয়ে প্রমাণ ভিত্তিক জবাব আপনাদের কাছ থেকে আশা করছি।

উত্তর

وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته

بسم الله الرحمن الرحيم

উপরোক্ত অভিযোগ ইতিহাস সম্পর্কে অজ্ঞ ব্যক্তি ছাড়া কেউ করতে পারে না।

আব্বাসী খিলাফত ধ্বংসের মূল কারণ ছিল ইসলামী শরীয়ত পালনে শিথীলতা এবং শাসকদের প্রবল স্বেচ্ছাচারি ও আয়েশী জিন্দেগী।

আর বাহ্যিক কারণ ছিল, আব্বাসী খিলাফতের সর্বশেষ খলীফা আব্দু্ল্লাহ মুস্তাসিম বিল্লাহ এর শিয়া প্রধানমন্ত্রী ইবনে আলকামীর ষড়যন্ত্র।

শিয়া ইবনে আলকামী আব্বাসী খিলাফতের পতন করে আলীয়ী খিলাফত প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন দেখতো। [দুআলুল ইসলাম লিজজাহাবী-২/১১৯]

ইবনে আলকামী খলীফার আস্থাভাজন ছিল। মুস্তা’সিম বিল্লাহ এর সেনাবাহিনীর একটি বৃহৎ অংশকে কৌশলে বরখাস্ত করে ইবনে আলকামী। আর খলীফাকে বুঝায় যে, তাদের হালাকু খাঁ এর বিরুদ্ধে যুদ্ধে পাঠানো হয়েছে। সেনাবাহিনীর এ দুর্বলতার সুযোগে বিভিন্ন পন্থায় হালাকু খাঁকে বাগদাদ আক্রমণের জন্য সে আহবান করে।

ঐতিহাসিক ইবনে খালদুন লিখেনঃ সৈন্যবাহিনীকে বরখাস্ত করার পর হালাকু খাঁ কে বাগদাদ হামলার জন্য শিয়া ইবনে আলকামী চিঠি লিখে। [তারীখে ইবনে খালদুন-৩/৬৬২, উর্দু-৪/৬৪৪]

ইমাম যাহাবী বলেন, ইবনে আলকামী আব্বাসী খিলাফত ধ্বংস করে আলীয়ী খিলাফত প্রতিষ্ঠা করার জন্য তাতারীদের কাছে চিঠি লিখে। [দুআলুল ইসলাম-২/১১৯]

ঐতিহাসিক আবুল ফিদা লিখেনঃ ইবনে আলকামী তাতারীদের বাগদাদে হামলা করার জন্য পত্র লিখে। সেই সাথে তার ভাইকে মৌখিক পয়গাম দিয়ে হালাকু খাঁর নিকট পাঠায়। [আবুল ফিদা-৩/১৯৩]

আল্লামা সুয়ূতী রহঃ লিখেনঃ

ركن المستعصم إلى وزيره مؤيد الدين العلقمي الرافضي، فأهلك الحرث والنسل، ولعب بالخليفة كيف أراد، وباطن التتار، وناصحهم، وأطمعهم في المجيء إلى العراق، وأخذ بغداد، وقطع الدولة العباسية، ليقيم خليفة من آل علي، وصار إذا جاء خبر منهم كتمه عن الخليفة ويطالع بأخبار الخليفة التتار إلى أن حصل ما حصل.

 

মুস্তা’সিম বিল্লাহ মুআইয়্যিদুদ্দীন ইবনে আলকামীকে তার প্রধানমন্ত্রী নিযুক্ত করেন। যে ছিল কট্টর শিয়া। যে মুস্তা’সিম বিল্লাহর রাজ্যকে চারপাশ থেকে ধ্বংস করে দেয়। তার হাতে খলীফা একজন ক্রীড়ানকে পরিণত হয়। সে তাতারীদের সাথে গোপন সম্পর্ক স্থাপন করে। তাদের সাথে গোপনে তথ্য আদান প্রদান করতে থাকে। এমনকি তাতারীদের ইরাক আক্রমণের জন্য প্ররোচিত করতে থাকে। বাগদাদ দখল করে আব্বাসী খিলাফতকে সমূলে ধ্বংস করতে কাজ করে যায়। তার উদ্দেশ্য ছিল যেন, কোনভাবে আলীয়ী খিলাফত প্রতিষ্ঠা লাভ করে। যখনি তাতারী বিষয়ে কোন সংবাদ বাগদাদে পৌঁছতো তখন সে তা গোপন করতো, কিন্তু এখানকার সকল সংবাদই তাতারীদের কাছে পৌঁছে যেতো। ফলে যা হবার তা’ই হল। [তারীখুল খুলাফা, সুয়ূতী-১/৩২৮, উর্দু-৭৮৯-৭৯০]

কট্টর শিয়া ইবনে আলকামীর প্ররোচনায় এবং হালাকু খাঁ এর সভাসদ আরেক কট্টর শিয়া জ্যোতির্বীদ নাসীরুদ্দীন তুসী বাগদাদ হামলার জন্য হালাকু খাঁকে উস্কানী দেয়। এভাবে হালাকু খাঁ বাগদাদ হামলা করে। ইবনে আলকামী “হালাকু খাঁ সন্ধি করেছে” মর্মে মিথ্যা কথা বলে খলীফাকে হালাকু খাঁর সামনে নিয়ে আসে। আর হালাকু খাঁ খলীফাকে হত্যা করে।

গাদ্দার বিশ্বাসঘাতক ইবনে আলকামী ষড়যন্ত্র করে আলীয়ী খিলাফত প্রতিষ্ঠার খায়েশ রাখলেও তার সে খায়েশ অপূর্ণই রয়ে যায়। কিন্তু মাঝখানে ইসলামী খিলাফত তছনছ হয়ে যায় নরপশু হালাকু খাঁ এর হাতে।

বিস্তারিত জানতে হলে দেখুন জালালুদ্দীন সুয়ূতী রহঃ এর তারীখুল খুলাফা, ইমাম যাহাবী রহঃ এর দুআলুল ইসলাম। আল্লামা ইবনে খালদুন রহঃ এর “তারীখে ইবনে খালদুন” ইত্যাদি গ্রন্থ।

নির্ভরযোগ্য ইতিহাস গ্রন্থগুলো প্রমাণ করছে যে, আব্বাসী খলীফা মুস্তাসিম বিল্লাহের শিয়া প্রধানমন্ত্রীর ষড়যন্ত্র ছিল বাহ্যিক কারণ আব্বাসী খিলাফত ধ্বংসের। আর মৌলিক কারণ ছিল মুসলমানদের ধর্ম পালনে উদাসীনতা এবং বিলাসিতা।

সেখানে হানাফী শাফেয়ী মাযহাবী মতবাদকে আব্বাসী খিলাফত ধ্বংসের কারণ বলা ইতিহাস সম্পর্কে অজ্ঞতা ছাড়া আমরা আর কী’বা বলতে পারি?

আল্লাহ তাআলা লা-মাযহাবী সম্প্রদায়ের মিথ্যাচার ও প্রতারণা থেকে মুসলিম উম্মাহের দ্বীন ও ঈমানকে হিফাযত করুন। আমীন।

والله اعلم بالصواب
উত্তর লিখনে
লুৎফুর রহমান ফরায়েজী

পরিচালক-তালীমুল ইসলাম ইনষ্টিটিউট এন্ড রিসার্চ সেন্টার ঢাকা।

উস্তাজুল ইফতা– জামিয়া কাসিমুল উলুম সালেহপুর, আমীনবাজার ঢাকা।

উস্তাজুল ইফতা-ইমাম আবূ হানীফা ইসলামী রিসার্চ সেন্টার পিরোজপুর।

ইমেইল– ahlehaqmedia2014@gmail.com

Print Friendly, PDF & Email

এটাও পড়ে দেখতে পারেন!

তারাবীহ সালাতের চার রাকাত পর বসে প্রচলিত “সুবহানা জিলমুলুকি ওয়ালমালাকুতু” যে দুআ পড়া হয় এর কোন ভিত্তি আছে কি?

প্রশ্ন আসসালামু আলাইকুম ওয়ারাহমাতুল্লাহি ওয়াবারকাতুহ। ১) তারাবীহ নামাজের চার রাকাত পর পর কোন দোয়া পড়া …