হোম / বিবিধ / কওমী মাদরাসা শিক্ষাবোর্ডের অনুমতি ছাড়া অবাধে কওমী মাদরাসা প্রতিষ্ঠা বন্ধ হোক!

কওমী মাদরাসা শিক্ষাবোর্ডের অনুমতি ছাড়া অবাধে কওমী মাদরাসা প্রতিষ্ঠা বন্ধ হোক!

লুৎফুর রহমান ফরায়েজী

বেশ কিছুদিন আগে। আসছিলাম বাড়ি থেকে। বাসে চড়ে আসছি। আমার অভ্যাস হল দাড়ি টুপি, পাঞ্জাবী পড়ুয়া কাউকে দেখলে তাকে আপন মনে হয়। মনে হয় লোকটি আমার খুবই কাছের মানুষ। যার কাছে মনের সুখ দুঃখের কথা বলা যাবে নির্ভরতায়। আর কওমী মাদরাসা দেখলে মনে হয় এটি আমার মাদরাসা। এর দুয়ারে পা রাখলে মনে হয় নিজের ঘরে পা রাখলাম।
এটি আমার আবেগী কথা নয়। দিলের কথা। মনের গহীনের উপলব্ধি। হৃদয়ে জমা কওমী মাদরাসার প্রতি আজন্ম ভালবাসার সেতুবন্ধন।

একদিন। ঢাকাগামী গাড়িতে আমার পাশে এসে বসলেন একজন দাড়ি টুপিওয়ালা মাদরাসা ছাত্র। কৌতুহলবশতঃ জিজ্ঞাসা করলামঃ পড়াশোনা করেন?
লোকটি জবাব দিলঃ হ্যাঁ।
– মাদরাসায়?
– হ্যাঁ।
– কওমী না আলিয়া?
– কওমী মাদরাসায়।
আগ্রহী হয়ে উঠলাম। মনটা ভাল হয়ে গেল। খুশি খুশি মনে জিজ্ঞাসা করলাম- “কোন মাদরাসায় পড়েন?
বিরস কণ্ঠে ভাইটি জবাব দেয়- “রূপগঞ্জ মাদরাসা”।
– রূপগঞ্জ কোন বড় কওমী মাদরাসা আছে নাকি?
– রাস্তার সাথেই আছে জামিয়া সালাফিয়া রূপগঞ্জ।
মেজাজটাই খারাপ হয়ে গেল। কারণ ওটা আসলে লা-মাযহাবীদের নিয়ন্ত্রিত মাদরাসা। আসল কওমী মাদরাসা নয়। নকল কওমী মাদরাসা। বললাম- ওটা কি কওমী মাদরাসা?
– হ্যাঁ। কওমী মাদরাসা।
– আচ্ছা, আমাকে বলেনতো কওমী মাদরাসা বলতে ঠিক কাদের বুঝায়? কোত্থেকে কওমী মাদরাসার উৎপত্তি হয়েছে?
– ঐইতো ভারতের দেওবন্দ থেকে।
– ঠিক তাই। তো দারুল উলুম দেওবন্দ হল কওমী মাদরাসার মূল। যেখান থেকে কওমী মাদরাসার উৎপত্তি। যারা উক্ত মাদরাসার আদর্শ ও শিক্ষা কারিকুলাম অনুসরণ করে প্রতিষ্ঠান করে থাকেন, সেসব মাদরাসাকে বলা হয় কওমী মাদরাসা। তো আপনাদের মাদরাসা কি দারুল উলুম দেওবন্দের শিক্ষা কারিকুলাম অনুসরণ করে?
– নাহ করে না।
– দারুল উলুম দেওবন্দ কুরআন ও সুন্নাহ ভিত্তিক যে আকিদা ও আমল ধারণ করেন, আপনারা কি হুবহু তা ধারণ করেন?
– নাহ করি না।
– শুধু করেন না তা বললে ভুল হবে। বলুন, আপনারা দারুল উলুম দেওবন্দ যা কওমী মাদরাসার মূল প্রণোধনা। সেই দারুল উলুমের অবস্থানকে ভুল ও বাতিল মনে করেন। তবুও আপনারা কিভাবে নিজেদের কওমী মাদরাসার ছাত্র বলতে পারেন? কিভাবে মানুষকে বলেন আপনাদের প্রতিষ্ঠানও কওমী মাদরাসা? মানুষতো কওমী মাদরাসা শব্দ দেখে মনে করবে দারুল উলুম দেওবন্দের অধীনত আপনারা। কিন্তু আপনারা ঠিক উল্টো। এভাবে কি মানুষকে ধোঁকা দিচ্ছেন না আপনারা?

চুপ হয়ে গেল ছেলেটা। ভাবনায় পড়ে গেলাম। পুরো দস্তুর লা-মাযহাবী মতবাদীরা জাতিকে ধোঁকা দেবার জন্য প্রতিষ্ঠা করছে কওমী মাদরাসা। মুখে বলছে কওমী মাদরাসা। আর শিক্ষা দিচ্ছে কওমী মাদরাসার মূল শিক্ষার উল্টো শিক্ষা। এভাবে ধোঁকা দেবার অধিকার তাদের কে দিল?
আমার বুঝে এসে যায়। কওমী মাদরাসা প্রতিষ্ঠার জন্য সুনির্দিষ্ট নীতিমালা বা কারো কাছ থেকে অনুমোদন নেবার প্রয়োজন না থাকায় যার ইচ্ছে সে’ই প্রতিষ্ঠা করছে কওমী মাদরাসা। শুনেছি জামাতে ইসলামীরাও নাকি ইদানিং কিছু কওমী মাদরাসা প্রতিষ্ঠার চিন্তা ভাবনা করছে। কওমী মাদরাসা করছে বিদআতি কবরপূজারীরাও। সেই সাথে লা-মাযহাবী বিদআতিরাও নেমেছে এই মিছিলে।

এই ধোঁকাবাজী কেন? কেন এই প্রতারণা?

বাতিলপন্থীদের কওমী মাদরাসা নামের প্রতারণা থেকে সাধারণ মানুষকে বাঁচাতে তাই কওমী মাদরাসা প্রতিষ্ঠার জন্য অনুমোদন বর্তমানে ফরজ হয়ে গেছে বলে আমি মনে করি।
কথার কথা, কওমী মাদরাসা প্রতিষ্ঠার জন্য বেফাকুল মাদারিসিল আরাবিয়া তথা কওমী মাদরাসা শিক্ষা বোর্ডে আবেদন করতে হবে। তখন বেফাকের প্রতিনিধি দল যাচাই করবে, কারা প্রতিষ্ঠানটি করতে চাচ্ছে? কেন করতে চাচ্ছে? কোন স্থানে করতে চাচ্ছে? কাদের নিয়ন্ত্রণে প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে? এসব যাচাই করে রিপোর্ট করবে প্রতিনিধি দল। তারপর বেফাক থেকে অনুমোদন পেলেই কেবল কওমী মাদরাসা প্রতিষ্ঠা করা যাবে। এছাড়া যার ইচ্ছে, যেখানে ইচ্ছে সে কওমী মাদরাসা নামে প্রতিষ্ঠান করতে পারবে না।

যদি এমনটি না হয়। তাহলে যেভাবে বাতিলপন্থীরা অনুমোদনহীনতার সুযোগ নিয়ে নিজেদের খেয়াল খুশি মত কওমী মাদরাসা প্রতিষ্ঠা করে চলছে। তা আমাদের জন্য ভবিষ্যতে বিষ ফোঁড়া হয়ে দাঁড়াবে বলেই আমার দৃঢ় বিশ্বাস।

আল্লাহ তাআলা হিফাযত করুন। মূল কওমী শিক্ষা ধারার বিরোধীদের কওমী মাদরাসা নামে প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠাকারীদের ঘৃণ্য ও প্রতারণামূলক মানসিকতাকে ধিক্কার জানাই। যদি কওমী ধারাকে পছন্দই না কর। তাহলে কেন জাতিকে ধোঁকা দিতে কওমী মাদরাসা নামে প্রতিষ্ঠান কর? লজ্জা করে না তোমাদের?

আমাদের আবেদন!

আমাদের দেশের শীর্ষ কওমী উলামায়ে কেরামগণকে উক্ত বিষয়টি সম্পর্কে ভেবে দেখার অনুরোধ থাকবে। এভাবে অনুমোদনহীনভাবে কওমী মাদরাসা প্রতিষ্ঠা হতে থাকলে আসল কওমী মাদরাসা আর নকল কওমী মাদরাসা নির্বাচনে সাধারণ মুসলমানরা এক সময় ধোঁয়াশায় পতিত হতে পারে। এর আগেই এর প্রতিকার করা উচিত বলে আমরা মনে করি।

Print Friendly, PDF & Email

এটাও পড়ে দেখতে পারেন!

পহেলা বৈশাখ উদযাপনঃ আত্মমর্যাদাহীন পরগাছা জাতির পরিচায়ক

লেখাটি পড়তে ক্লিক করুন