হোম / আহলে হাদীস / ইফতারের পূর্বে দুআ কবুল হওয়ার বক্তব্য নির্ভর হাদীসটি বাতিল? মুযাফফর বিন মুহসিনের জালিয়াতির জবাব

ইফতারের পূর্বে দুআ কবুল হওয়ার বক্তব্য নির্ভর হাদীসটি বাতিল? মুযাফফর বিন মুহসিনের জালিয়াতির জবাব

প্রশ্ন

সম্মানিত মুফতী সাহেব!

আমার প্রশ্ন হল, ইউটিউবে একটি ভিডিও দেখলাম শায়েখ মুজাফফর বিন মুহসিন সাহেবের। যেখানে তিনি বলেছেন ইফতারের পূর্বে দুআ কবুল হয় কথাটি নাকি ভুল। এ ব্যাপারে ইবনে মাজাহের হাদীসটি নাকি জাল। কারণ সেখানে একজন রাবী আছেন ইসহাক বিন উবায়দুল্লাহ।

উক্ত ভিডিওটি আপনাদের কাছে পাঠালাম। দয়া করে এ বিষয়ে অতি দ্রুত জবাব প্রদান করে মনের প্রশান্তি যুগাবেন আশা করি।

উত্তর

بسم الله الرحمن الرحيم

আমরা মুজাফফর সাহেবের উক্ত ভিডিওটি দেখেছি। তিনি তাতে বলেছেন-

“ইফতারের পূর্বের দুআ কবুলের কোন ফযীলত নেই।আমাদের দেশে একটি আমূলকে গুরুত্ব দেবার জন্য মূলত এটাকে চালু কর হয়েছে। সেটা হল ইফতারের পূর্ব মুহুতে দলবদ্ধ দুআকে গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। কিন্তু এখানে একটি দুঃখজনক বিষয় হচ্ছে, ইফতারের পূর্বে দুআ কবুল হয়, মর্মে ইবনে মাজায় ১৭৫৩ নং হাদীস রয়েছে। এই একটা হাদীস আছে। যাতে একজন বর্ণনাকারী ইসহাক বিন উবায়দুল্লাহ রয়েছে। যাকে সকল মুহাদ্দিস প্রত্যাখ্যান করেছেন। যার কারণে হাদীসটি যঈফ”।

এই হল মুযাফফর সাহেবের বক্তব্য।

এই এক মিনিটি ষোল সেকেন্ডের বক্তব্যে তিনি কমপক্ষে ১০টি ভুল করেছেন। প্রথমে আমরা উক্ত হাদীসটি দেখে নেই।

1753 – حَدَّثَنَا هِشَامُ بْنُ عَمَّارٍ قَالَ: حَدَّثَنَا الْوَلِيدُ بْنُ مُسْلِمٍ قَالَ: حَدَّثَنَا إِسْحَاقُ بْنُ عُبَيْدِ اللَّهِ الْمَدَنِيُّ، قَالَ: سَمِعْتُ عَبْدَ اللَّهِ بْنَ أَبِي مُلَيْكَةَ، يَقُولُ: سَمِعْتُ عَبْدَ اللَّهِ بْنَ عَمْرِو بْنِ الْعَاصِ، يَقُولُ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «إِنَّ لِلصَّائِمِ عِنْدَ فِطْرِهِ لَدَعْوَةً مَا تُرَدُّ»

হযরত আব্দুল্লাহ বিন আমর বিন আস রাঃ থেকে বর্ণিত। রাসূল সাঃ ইরশাদ করেছেন, নিশ্চয় ইফতারের সময় রোযাদারের দুআকে ফিরিয়ে দেয়া হয় না। {সুনানে ইবন মাজাহ, হাদীস নং-১৭৫৩}

যা পরিস্কার ভাষায় ইফতারের পূর্বে রোযাদারের দুআ কবুল হয় মর্মে প্রমাণ বহন করছে।

উক্ত হাদীসটির ব্যাপারে মুজাফফর সাহেব যা বলেছেন উক্ত এক মিনিট ষোল সেকেন্টের বক্তব্যে। তিনি তাতে কমপক্ষে দশটি ভুল করেছেন। যা নিচে উদ্ধৃত করা হল।

যথা-

ইফতারের পূর্বে দুআ কবুলের কোন ফযীলত নেই। অথচ সে নিজেই বলছে এ ব্যাপারে হাদীস আছে। সেই সাথে চূড়ান্ত মিথ্যার আশ্রয় নিয়ে মানুষকে দুআর মত একটি ইবাদত থেকে বিরত রাখার ষড়যন্ত্র করেছে। অথচ এ বিষয়ে একাধিক হাদীস রয়েছে।

আমল শব্দকে তিনি উচ্চারণ করেছেন আমূল! কোথায় আমল আর কোথায় আমূল!! যিনি আমল আর আমূল দু’টি শব্দকে আলাদা করে বলতে জানেন না, তিনিও নাকি এদেশের মহা শায়েখ!

শুধুমাত্র সম্মিলিত দুআকে চালু করার জন্য এ কথাটি বলা হয়!

এটিও একটি পরিস্কার মিথ্যা কথা। কারণ হাদীসে আছে বলেই একথা বলা হয়ে থাকে। আমরা অধিকাংশ মুসলমানই সম্মিলিতভাবে নয়, বরং একাকী ইফতার করে থাকি। ইফতারের পূর্বে দুআ করে থাকি। তাহলে সম্মিলিত মুনাজাতকে চালু করার জন্য এটি বলা হয় কথাটি কতটুকু যৌক্তিক থাকছে? এমন উদ্ভট বক্তব্য দেয়া হাদীস সম্পর্কে এবং মুসলিম সমাজ সম্পর্কে অজ্ঞতা বৈ কিছু নয়।

তিনি বলেছেন ইফতারের পূর্বে দুআ কবুল হয় মর্মে হাদীস আছে একটি। অথচ আরো একটি সহীহ হাদীস আছে অন্যান্য হাদীস গ্রন্থে। তাহলে এ সংক্রান্ত হাদীস শুধু একটি আছে বলা সুষ্পষ্ট অজ্ঞতা কিংবা মিথ্যাচার।

দেখুন সেই হাদীসটি

عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ، عَنْ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، قَالَ: ” ثَلاثٌ لَا تُرَدُّ دَعْوَتُهُمُ: الصَّائِمُ حِينَ يُفْطِرُ، وَالإِمَامُ الْعَادِلُ، وَدَعْوَةُ الْمَظْلُومِ

হযরত আবূ হুরায়রা রাঃ থেকে বর্ণিত। রাসূল সাঃ ইরশাদ করেছেন, তিনটি সময় তোমাদের দুআকে ফেরত দেয়া হয় না, তাহলো, ১-রোযাদারের ইফতারের সময়কার দুআ, ২-ন্যায়পরায়ন ইমামের দুআ। ৩-মাজলুম তথা নিপিড়িত ব্যক্তির দুআ। {শরহুস সুন্নাহ লিলবাগাবী, হাদীস নং-১৩৯, জামেউল উসূল, হাদীস নং-২১০৩, ফাতহুল গাফফার, হাদীস নং-২৭৫৪, মিশকাতুল মাসাবীহ, হাদীস নং-২২৪৯}

উক্ত হাদীস বিষয়ে মুহাদ্দিসদের মন্তব্য

১ নং ভুল

আল্লামা হায়তামী রহঃ বলেন- صحيح أو حسنতথা এটি সহীহ বা হাসান। {আযযাওয়াজের-১/১৯৭}

২ নং ভুল

আল্লামা মুনজিরী রহঃ বলেন, إسناده صحيح أو حسن أو ما قاربهما] তথা এর সনদটি সহীহ বা হাসান বার এর কাছাকাছি। {আততারগীব ওয়াততারহীব-২/১১১}

৩ নং ভুল

আল্লামা ইবনে হাজার আসকালানী রহঃ বলেন, حسن তথা এটি হাসান। {তাখরীজু মিশকাতিল মাসাবীহ-২/৪১৫}

যেখানে সহীহ বা সুনিশ্চিত হাসান পর্যায়ের আরেক বর্ণনায় ইফতারের পূর্ব মুহুর্তের দুআ কবুলের বিষয়টি বর্ণিত হয়েছে। সেখানে একথা বলা যে, একটি মাত্র হাদীস এ ব্যাপারে আছে এটি হাদীস সম্পর্কে চূড়ান্ত অজ্ঞতা ছাড়া আর কী হতে পারে?

৫ নং ভুল

হাদীসটি পাঠ করতে গিয়ে “ইন্দা ফিতরীহি” বাক্যটি যা হাদীসের মাঝখানে ছিল, তাকে তিনি শেষে উচ্চারণ করেছেন। যা হাদীসের বর্ণনাভঙ্গিকে পাল্টে দিয়েছে। রাসূল সাঃ যে শব্দে হাদীসটি বলেছেন, তা পাল্টে মুজাফফর সাহেব নিজস্ব ঢংয়ে উক্ত হাদীস বলেছেন। নবী বলেছেন “ইন্দা ফিতরীহী” শব্দ মাঝে, আর মুজাফফর সেটিকে নিয়ে গেছে শেষে। এ কেমন কান্ড?

৬ নং ভুল

হাদীসের শব্দ হল “ফিতরিহী” জমীরসহ। আর মুজাফফর উচ্চারণ করেছে “ফিতরি” জমির ছাড়া। এটিও তার একটি অজ্ঞতা।

৭ নং ভুল

হাদীসের শব্দ হল মাজহুল “মা তুরাদ্দু” কিন্তু মুজাফফর সাহেব হাদীসের ইবারত পাল্টে দিয়ে মাজহুলকে মারূফ বানিয়ে উচ্চারণ করেছেন “মা তারুদ্দু”।

 নং ভুল

“মা তুরাদ্দু” মাজহুলকে মারূফ উচ্চারণ করলেও হাদীসটির অনুবাদ করতে গিয়ে মারূফ রেখে মাজহুলের অনুবাদ করেছেন। যা তার পরিস্কার মুর্খতার পরিচয় বহন করে।

৯ নং ভুল

ইসহাক বিন উবায়দুল্লাহকে সকল মুহাদ্দিস নাকি প্রত্যাখ্যান করেছেন।

অথচ এটি একটি ডাহা মিথ্যা কথা।

হাদীস ও উসূলে হাদীস এবং জারাহ তাদীল সম্পর্কে এমন কূপমন্ডুক ব্যক্তি কি করে সাহস পায় হাদীস সম্পর্কে মন্তব্য করতে তা আমাদের বুঝে আসে না। কি করে এতটা স্পর্ধার সাথে বলে দিল যে, ইসহাক বিন উবায়দুল্লাহকে সকল মুহাদ্দিস নাকি প্রত্যাখ্যাত বলেছেন! নাউজুবিল্লাহ। কুপের ব্যাঙয়ের কাছে যেমন তার উপরে দেখা ছোট্ট অংশটাই আকাশ। তেমনি আমাদের দেশের এসব কথিত শায়েখদের হাদীস সম্পর্কে পড়াশোনা আলবানী সাহেবের সিলসিলা পর্যন্ত সীমাবদ্ধ। সেই সীমাবদ্ধ জ্ঞানে যেটিকে পাবেন, সেটিই তাদের সকল মুহাদ্দিসদের মত বলে মনে হয়ে যায়।

এ অজ্ঞ শায়েখ যদি জারাহ তাদীলের অল্প কিছু গ্রন্থ দেখার সৌভাগ্য অর্জন করতো, তাহলে এমন মুর্খতা হয়তো প্রদর্শন করতো না।

দেখুন হাদীস বিশারদগণ ইসহাক বিন উবায়দুল্লাহ সম্পর্কে কী বলেছেন?

দারে ইহয়ায়ু কুতুবিল আরাবিয়্যা প্রকাশনী সৌদী আরব থেকে ছাপা ইবনে মাজাহ শরীফে উক্ত হাদীসের টিকায় আরবের বর্তমানের প্রসিদ্ধ হাদীস বিশারদ ফুয়াদ আব্দুল বাকী লিখেছেন-

في الزوائد إسناده صحيح. لأن إسحاق بن عبيد الله بن الحارث قال النسائي ليس به بأس. وقال أبو زرعة ثقة. وذكره ابن حبان في الثقات. وباقي رجال الإسناد على شرط البخاري.

যাওয়ায়েদ গ্রন্থে এসেছে যে, এর সনদটি সহীহ। কেননা, ইসহাক বিন উবায়দুল্লাহ বিন হারিস এর ক্ষেত্রে ইমাম নাসায়ী রহঃ বলেছেন, এ রাবীর ব্যাপারে কোন সমস্যা নেই। আর আবু যুরআ বলেন, তিনি সিকা রাবী। আর ইবনে হিব্বান রহঃ তার “আসসিক্বাত” গ্রন্থে তার নাম উল্লেখ করেছেন। {দেখুন-সুনানে ইবনে মাজাহ সৌদী ছাপার ফুয়াদ আব্দুল বাকীর টিকা, হাদীস নং-১৭৫৩}

ইমাম বুখারী রহঃ তার তারীখুল কাবীর গ্রন্থে তার জীবনী এনেছেন কিন্তু আমাদের দেশের কৃতি সন্তান মুজাফফরের মত উক্ত রাবীকে প্রত্যাখ্যাত বলতে পারেননি। দেখুন- তারীকুল কাবীর, রাবী নং-১২৬৫।

ইবনে হিব্বান রহঃ তার সিকাত গ্রন্থে তার নাম এনেছেন। দেখুন-“আসসিকাত, বর্ণনা নং-৬৬৬৭।

যেখানে ইমাম নাসায়ী, ইমাম ইবনে হিব্বান রহঃ ও ইমাম আবু যুরআ এর মত ইমামগণ উক্ত রাবীকে সিকা বলে স্বীকৃতি প্রদান করেছেন। এছাড়া কোন গ্রহণযোগ্য ইমাম তাকে প্রত্যাখ্যাত বলে মন্তব্য করেননি। সেখানে ইসহাক বিন উবায়দুল্লাহকে সকল মুহাদ্দিসগণ প্রত্যাখ্যান করেছেন বলা কতটা ধৃষ্টতা ভাবা যায়?

এছাড়া এ হাদীসের ক্ষেত্রে মুহাদ্দিসীনে কেরাম বলেন-

১ আল্লামা  বুসিরী রহঃ বলেন-

إسناده صحيح، وله شاهدতথা এর সনদটি সহীহ। {ইতহাফুল খাইরাহ-৩/১০২}

ইবনে হাজার আসকালানী রহঃ বলেন, এ হাদীসটি হাসান। {আলফতুহাতুর রাব্বানিয়্যাহ-৪/৩৪২}

মুহাদ্দিসীনে কেরাম যেখানে উক্ত রাবীকে সেকাহ বলছেন, সেই সাথে হাদীসটিকে সহীহ ও হাসান বলছেন, সেখানে এ হাদীসকে বাতিল বলা, অগ্রহণীয় বলা, ইসহাক বিন উবায়দুল্লাহকে সমস্ত মুহাদ্দিসরা প্রত্যাখ্যান করেছেন বলা কতটা ধৃষ্টতা, কতটা মুর্খতা তা কল্পনাও করতেও কষ্ট হচ্ছে আমাদের।

আল্লাহ তাআলা এমন জাহিল শায়েখদের থেকে আমাদের হিফাযত করুন।

১০ নং ভুল!

সকল মুহাদ্দিসগণ রাবীকে প্রত্যখ্যান করার পরও হাদীসটি জঈফ। অথচ সকল মুহাদ্দিস হাদীসের কোন রাবীকে প্রত্যাখ্যান করলে সেটি জঈফের তবকা পাড় হয়ে জাল হযে যায়। উসূলে হাদীসের এ সহজ কায়দাটিও রপ্ত করতে পারেননি মুজাফফর সাহেব।

সুতরাং বুঝা গেল ইফতারের পূর্বে দুআ কবুলের হাদীসটি সম্পূর্ণ আমলযোগ্য সহীহ হাদীস। সেই সাথে এ কথিত শায়েখ হাদীস সম্পর্কে একজন চূড়ান্ত অজ্ঞ ছাড়া আর কিছু নয়। এমন জাহিল ব্যক্তির বয়ান শুনা, তাকে শায়েখ বলা কিছুতেই কোন মুসলমানের জন্য শুভনীয় নয়। তার দাজ্জালীপনা থেকে সকলকে সতর্ক থাকতে হবে।

ভিডিওতে দেখতে ক্লিক করুন

والله اعلم بالصواب

উত্তর লিখনে

লুৎফুর রহমান ফরায়েজী

পরিচালক-তালীমুল ইসলাম ইনষ্টিটিউট এন্ড রিসার্চ সেন্টার ঢাকা।

ইমেইল- ahlehaqmedia2014@gmail.com

lutforfarazi@yahoo.com

Print Friendly, PDF & Email

এটাও পড়ে দেখতে পারেন!

তারাবীহ নামাযের চার রাকাতের পর বসে মুনাজাত করা যাবে কি?

প্রশ্ন তারাবীহ নামাজে চার রাকাত পর পর মোনাজাত করা কি জায়াজ আছে? উত্তর بسم الله …