হোম / ঈমান ও আমল / রিজিক হালাল না হলে কি দুআ কবুল হয় না?

রিজিক হালাল না হলে কি দুআ কবুল হয় না?

প্রশ্ন 

মোঃ লুৎফর রহমান

পল্লবী।মিরপুর

আসসালামুআলাইকুম।
সন্মানিত মুফতি সাহেব,
উপার্জন/রিজিক হালাল না হলে নামাজ রোজা দোয়া ইত্যাদি সহ সমস্ত ইবাদত কবুল
হওয়া বা না হওয়ার হুকুম কি,এ বিষয়ে বিস্তারিত জানাবেন আশা করছি। আবার
উপার্জন/রিজিক কতটুকু হারাম হলে হুকুম কি হবে তাও জানাবেন দয়া করে।

উত্তর:

وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته

بسم الله الرحمن الرحيم

ইবাদতে ও দুআ কবুল হওয়ার ব্যাপারে হালাল খাদ্যের অনেক প্রভাব রয়েছে। খাদ্য হালাল না হলে ইবাদত ও দুআ কবুল হওয়ার যোগ্য হয় না। হযরত আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত, রাসূলে আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেছেন-

« أيها الناس إن الله طيب لا يقبل إلا طيبا وإن الله أمر المؤمنين بما أمر به المرسلين فقال ( يا أيها الرسل كلوا من الطيبات واعملوا صالحا إنى بما تعملون عليم) وقال (يا أيها الذين آمنوا كلوا من طيبات ما رزقناكم) ». ثم ذكر الرجل يطيل السفر أشعث أغبر يمد يديه إلى السماء يا رب يا رب ومطعمه حرام ومشربه حرام وملبسه حرام وغذى بالحرام فأنى يستجاب لذلك ».

তরজামা: হে লোক সকল! আল্লাহ তাআলা হলেন পবিত্র। আর তিনি পবিত্রতা ছাড়া কবুলই করেন না। আল্লাহ তাআলা মুমিনদেরকে তাই নির্দেশ দিয়েছেন যা রাসূলগণকে দিয়েছেন।  তিনি বলেছেন “হে রাসূলগণ পবিত্র বস্তু আহার করুন এবং সৎকাজ করুন। আপনারা যা করেন সে বিষয়ে আমি পরিজ্ঞাত”। (সূরা মুমিনুন-৫২) তিনি অন্যত্র ইরশাদ করেন “হে ঈমানদারগণ, তোমরা পবিত্র বস্তু-সামগ্রী আহার কর, যেগুলো আমি তোমাদেরকে রুযী হিসাবে দান করেছি। (সূরা বাকারহ -১৭২) এরপর এক লোকের কথা বললেন যে দীর্ঘ সফর করে আসে। এবং অত্যন্ত ব্যাকুলভাবে দু‘ হাত তুলে আল্লাহর দরবারে বলতে থাকে, ইয়া পরওয়ারদেগার! ইয়া রব! । কিন্তু যেহেতু সে ব্যক্তির পানাহার সামগ্রী হারাম উপার্জনের, পরিধেয় পোষাক- পরিচ্ছদ হারাম পয়সায় সংগৃহীত, এমতাবস্থায় তার দেয়া কি করে কবুল হতে পারে?।  (মুসলিম শরীফ, হাদীস নং ২৩৯৩)

সূরা মুমিনুন-(৫২) এর উক্ত আয়াত বিশেষভাবে লক্ষ্যযোগ্য।  আল্লাহ তাআলা পয়গম্বরগণকে নিস্পাপ রেখেছিলেন। তঁদেরকেই যখন হালাল ও পবিত্র বস্তু আহার করার এবং সৎকর্ম করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে তখন উম্মতের জন্য এই আদেশ আরো পালনীয়।

হাদীসটি নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা-ভাবনা করলে বুঝা যায় যে, কিছু কিছু শুভ মুহূর্ত রয়েছে যে সময়কার দুআ আল্লাহ তাআলা ফেরত দেন না। দীর্ঘ সফর করে আসা ক্লান্ত শ্রান্ত আলোচ্য ব্যক্তির মধ্যে দুআ কবুল হওয়ার অনেক সবব ও  উপকরণ বিদ্যমান থাকলেও  যেহেতু তার  পানাহার সামগ্রী হারাম উপার্জনের, পরিধেয় পোষাক-পরিচ্ছদ হারাম পয়সায় সংগৃহীত, এমতাবস্থায় তার দুআ কবুল হওয়া সুদূর পরাহত।

হাদীসটির একটি ব্যাখ্যা

এ হাদীসের ব্যাখ্যায় আল্লামা ইবনে আব্দুল বার রহ. তাঁর বিখ্যাত ‘জামিউল উলুমি ওয়াল হিকাম’ গ্রন্থে বলেন-

* وفي هذا الحديث إشارةٌ إلى أنَّه لا يقبل العملُ ولا يزكو إلاَّ بأكل الحلال ، وإنَّ أكل الحرام يفسد العمل ، ويمنع قبولَه ، فإنَّه قال بعد تقريره : (( إنَّ الله لا يقبلُ إلاَّ طيباً )) إنَّ الله أمر المؤمنين بما أمر به المرسلين ، فقال : { يَا أَيُّهَا الرُّسُلُ كُلُوا مِنَ الطَّيِّبَاتِ وَاعْمَلُوا صَالِحاً } ، وقال : { يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا كُلُوا مِنْ طَيِّبَاتِ مَا رَزَقْنَاكُمْ } .

অর্থাৎ এ হাদীসে এ দিকে ইঙ্গিত রয়েছে যে, হালাল ভক্ষণ ব্যতীত আমল গৃহীত হয়না এবং তা পরিশুদ্ধি লাভ করে না। হারাম ভক্ষণ আমলকে বিনষ্ট করে দেয় এবং তা আল্লাহর দরবারে গৃহীত হতে বাধা প্রদান করে। …

কোন  আমল কবুল হওয়া না হওয়া সংক্রান্ত একটি মৌল কথা:

এ প্রসঙ্গে যাহেদ আবু আব্দুল্লাহ আননাজী  রহ. খুব চমৎকার মন্তব্য করেছেন। তিনি বলেন-

          وقال أبو عبد الله الناجي الزاهد رحمه الله : خمسُ خصال بها تمامُ العمل : الإيمان بمعرفة الله – عز وجل – ، ومعرفةُ الحقِّ ، وإخلاصُ العمل للهِ ، والعمل على السُّنَّةِ ، وأكلُ الحلالِ، فإن فُقدَتْ واحدةٌ، لم يرتفع العملُ ، وذلك أنَّك إذا عرَفت الله – عز وجل – ، ولم تَعرف الحقَّ ، لم تنتفع ، وإذا عرفتَ الحقَّ ، ولم تَعْرِفِ الله ، لم تنتفع ، وإنْ عرفتَ الله ، وعرفت الحقَّ ، ولم تُخْلِصِ العمل ، لم تنتفع ، وإنْ عرفت الله ، وعرفت الحقَّ ، وأخلصت العمل ، ولم يكن على السُّنة ، لم تنتفع ، وإنْ تمَّتِ الأربع ، ولم يكن الأكلُ من حلال لم تنتفع .

পাঁচটি বৈশিষ্ট্য ও গুণাবলী এমন যদ্বারা আমল পূর্ণাঙ্গতা লাভ করে। ১. আল্লাহ্ পাকের মারেফাতে বিশ্বাস স্থাপন করা। ২. হক ও হক্কানিয়াত জানা ও বুঝা। ৩. আমল সযতœ নিষ্ঠায় একমাত্র আল্লাহ তাআলার জন্য করা।৪.আমল (মনগড়া পদ্ধতিতে না করে)  সুন্নাত মোতাবেক করা। ৫. আহার্য হালাল হওয়া। যদি এই পাঁচটি বৈশিষ্ট্যর বত্যয় ঘটে তথা কোন একটি বৈশিষ্ট্য অনুপস্থিত থাকে  তাহলে সে আমল উর্ধ্ব লোকে বিচরণ করবে না। (তথা আল্লাহ তাআলার দরবারে গৃহীত হবে না)। কারণ-

কেউ আল্লাহ পাকের মারেফাত লাভ করল অথচ হক ও হক্কানিয়াত চিনল না  তা উপকারে আসবে না। আবার কেউ আল্লাহ পাকের মারেফাত লাভ করল হক -হক্কানিয়াত ও চিনল কিন্তু  ইখলাস ও নিষ্ঠায় সে রিক্ত  ও শূণ্য তাহলে  তা তার উপকারে আসবে না। কেউ আল্লাহ পাকের মারেফাত লাভ করল হক -হক্কানিয়াত ও চিনল আবার  ইখলাস- নিষ্ঠায়ও  তার কমতি নেয় কিন্তু তার আমলের পদ্ধতিটি  সুন্নাহ সম্মত নয়  তাহলে এ আমল তার  উপকারে  আসবে না। যদি উক্ত চারও  বৈশিষ্ট্য পূর্ণ মাত্রায় পাওয়া যায় অথচ আহার্য হালাল  না হয় তাহলেও এ আমল উপকারে আসবে না।

(ইবনে রজব হাম্বলী -জামিউল উলুমি ওয়াল হিকাম, হাদীস নং ১০.)

এখানে একটি বিষয় বিশেষভাবে লক্ষণযোগ্য: নামাজ রোজা ও অন্যান্য ইবাদত থেকে বান্দার উপর অর্পিত ফরজ দ্বায়িত্ব থেকে নিস্কৃতি লাভ করা এক জিনিস। আর হারাম ভক্ষণের ফলে ইবাদত বন্দেগী কবুল হওয়া না হওয়া আরেক বিষয়। আপনার প্রশ্নটি দ্বিতীয় অংশের সাথে সম্পর্কিত। প্রথমাংশ তথা এরূপ ব্যক্তি তার উপর অর্পিত ফরজ দ্বায়িত্ব থেকে নিস্কৃতি লাভ করবে এতে কোন সন্দেহ নেই।

উল্লেখ্য যে, হারাম থেকে বেঁচে থাকার জন্য আল্লাহ্ তাআলার কাছে বেশি বেশি দোআ করতে কবে এবং এর জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করে যেতে হবে। কোন আল্লাহ ওয়ালা বুযুর্গের সাহচার্য গ্রহণ এক্ষেত্রে বড় সহায়ক হবে বলে মনে করি। তাই বলে নামায, রোজা ও অন্যান্য ইবাদত বাদ দেওয়া যাবে না। মনে রাখতে হবে। হারামতো হারামই স্বল্প হোক আর বেশি হোক।

খাদ্য হালাল না হলে তার ক্ষতি:

খাদ্য হালাল না হলে তার ক্ষতি অনেক বিস্তীর্ণ ও সুদূরপ্রসারী। তন্মধ্যে গুটি কয়েক উল্লেখ করা হলো মাত্র-

১.

খাদ্য হারাম হলে সৎকর্মের ইচ্ছা করা সত্ত্বেও তাতে নানা বিপত্তি প্রতিন্ধক হয়ে যায়। পক্ষান্তরে খাদ্য হালাল হলে সৎকাজের তাওফীক আপনা-আপনি হতে থাকে।

২.

খারাপ আহার্য কলবকে বিনষ্ট করে দেয় ফলে অন্তর থেকে ইখলাস, কোমলতা ইত্যাদি সৎ গুণাবলী বিদায় গ্রহণ করে।

মোটকথা উপরের আলোচনা থেকে আমারা বুঝতে পারলাম যে, নেক আমলের ব্যাপারে হালাল খাদ্যের বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। অনুরূপ হালাল খাদ্য গ্রহণে দোয়া কবুল হওয়ার আশা এবং হারাম খাদ্যের প্রতিক্রিয়ায় তা কবুল না হওয়ার আশঙ্কায়ই থাকে বেশী।

وفى جامع العلوم والحكم لابن رجب الحنبلى  …لكن القبول قد يُراد به الرضا بالعمل ، ومدحُ فاعله ، والثناءُ عليه بين الملائكة والمباهاةُ به ، وقد يُراد به حصولُ الثواب والأجر عليه ، وقد يراد به سقوط الفرض به من الذمة ، فإنْ كان المراد هاهنا القبولَ بالمعنى الأوَّل أو الثاني لم يمنع ذلك من سقوط الفرض به من الذمة((1)) ، كما ورد أنَّه لا تقبل صلاة الآبق ، ولا المرأة التي زوجها عليها ساخطٌ ، ولا من أتى كاهناً ، ولا من شرب الخمر أربعين يوماً ، والمراد – والله أعلم – نفي القبول بالمعنى الأوَّل أو الثاني ، وهو المراد – والله أعلم – من قوله – عز وجل – : { إنَّما يَتقبَّلُ الله من المتَّقين } ((2)) . ولهذا كانت هذه الآية يشتدُّ منها خوفُ السَّلف على نفوسهم ، فخافوا أنْ لا يكونوا من المتَّقين الذين يُتقبل منهم .( الحديث العاشر)

…ولأن أكل الحرام يفسد القلوب ، فتحرم الرقة والاخلاص ، فلا تقبل الأعمال . وإشارة الحديث إلى أنه لم يقبل ؛ لأنه ليس بطيب .- المُفْهِمْ ،لِمَا أَشْكَلَ مِنْ تلخيصِ كتابِ مُسْلِمْ –

والله اعلم بالصواب
উত্তর লিখনে

মাওলানা মুহসিনুদ্দীন খান

গবেষক-তালীমুল ইসলাম ইনষ্টিটিউট এন্ড রিসার্চ সেন্টার ঢাকা।

নিরীক্ষক

লুৎফুর রহমান ফরায়েজী

পরিচালক-তালীমুল ইসলাম ইনষ্টিটিউট এন্ড রিসার্চ সেন্টার ঢাকা।

উস্তাজুল ইফতা– জামিয়া কাসিমুল উলুম সালেহপুর, আমীনবাজার ঢাকা।

ইমেইল- ahlehaqmedia2014@gmail.com

Print Friendly, PDF & Email

এটাও পড়ে দেখতে পারেন!

তারাবীহ সালাতের চার রাকাত পর বসে প্রচলিত “সুবহানা জিলমুলুকি ওয়ালমালাকুতু” যে দুআ পড়া হয় এর কোন ভিত্তি আছে কি?

প্রশ্ন আসসালামু আলাইকুম ওয়ারাহমাতুল্লাহি ওয়াবারকাতুহ। ১) তারাবীহ নামাজের চার রাকাত পর পর কোন দোয়া পড়া …