হোম / আহলে হাদীস / বিশ্ব ইজতিমা বিষয়ে পাঁচটি অহেতুক অভিযোগের জবাব

বিশ্ব ইজতিমা বিষয়ে পাঁচটি অহেতুক অভিযোগের জবাব

প্রশ্ন

আসসালামু আলাইকুম।

এই লিঙ্কে ইজতেমা সম্পর্কে কিছু অভিযোগ করা হয়েছে-

“সত্যান্বেষী বন্ধুগণ! তাবলীগী ভাইয়েরা টোঙ্গির ময়দানে জুমআর দিনে লাখো মানুষের জুমআর নামাযের মধ্য দিয়ে ইজতেমা শুরু করেছেন। সাধারণ লোকদের কাছে বিষয়টি কত সুন্দর! জুমআর দিনে ইজতেমা শুরু হল, আবার জুমআর নামায পড়ে। দেখা যায়, তারা অনেক সময় জুমআ দিয়ে শুরু না করলেও শেষ দিনটি জুমআ’হ রাখে, যে দিনে বিশ্ব মুনাজাতের মাধ্যমে ইজতেমা শেষ হয়।

আপনি যদি সত্যিকারে সঠিক ইসলামের বিধান পালনকারী হন, তাহলে আমি কিছু প্রশ্ন করতে চাইঃ-

১- নবী (صلى الله عليه وسلم) তাঁর জীবনে কখনো মসজিদের বাইরে ময়দানে জুমআর নামায আদায় করেছিলেন কি? অথচ তাঁর জীবনের অনেকটা সময় সফরে ভরা।

২- এ কথা তাবলীগী জামাআতের আমীর সাহেবানরা জানেন না কি যে, জুমআ’র নামায ওয়াজেব হওয়ার একটি অন্যতম শর্ত হচ্ছে ‘ইক্বামত’ অর্থাৎ মানুষেরা যেন নিজ বাসস্থানে বসবাসকারী হয়, মুসাফির না হয়। তাই আরাফার দিন জুমআ হলেও নবী (صلى الله عليه وسلم) আরাফার ময়দানে জুমআ পড়েন নি। আজ টোঙ্গির ময়দারে যারা বিভিন্ন স্থান থেকে জমায়েত হয়েছেন তারা মুসাফির নন কি?

৩- খোদ হানাফী মাযহাবে এ কথা বলা হয় নি কি যে, জুমআ কেবল শহরবাসীদের জন্য গ্রাম বাসীদের উপর জুমআহ নেই। [যদিও এতে মতভেদ রয়েছে কিন্তু হানাফী মাযহাবে এটা স্বীকৃত] তাহলে হানাফীর দাবী করে খোদ নিজ ইমামের মাযহাবের বিপরীত করছেন না কি? না এটা তাবলিগী মাযহাবের নামায।

৪- বলার অপেক্ষা রাখে না, এই ইজতেমার প্রায় সব মানুষই মুসাফির কিন্তু তারা নামাযের সময় ‘কসর’ নামায পড়েন না। অথচ নবী (صلى الله عليه وسلم) সফরে কসর নামায পড়তেন।

৫- সেই ময়দানে নামায পড়তে মানুষকে উদ্বুদ্ধ করা হচ্ছে কিংবা মানুষেরা সেখানে নামায পড়তে আগ্রহী হচ্ছে; অথচ ফরয নামায মসজিদে আদায় করা উত্তম।

এই কারণে বলি, তাবলীগী জামাআত বা অন্যন্য জামাত চেনার জন্য লোকদের বাহ্যিক বেশ-ভুষা দেখলে হয় না। দেখতে হয়, তাদের আমল। নবীর তরীকায় হলে ঠিক নচেৎ প্রত্যাখ্যাত। তারা এই ভাবে এই ইজতেমার মাধ্যমে একাধিক বিদআত আবিষ্কার করে চলেছে।

আর সাধারণ জনগণ হুজুগে পিছনে ছুটে চলেছে। ইসলামের প্রকৃত বিধান কি, মুক্বীম বা মুসাফির অবস্থায় নবী (صلى الله عليه وسلم) এর সুন্নত কি তা জানি না, জানার চেষ্টাও করি না। অন্যদিকে ইজতেমাকারীরা ইসলামী রূপ-সুরতে,সংখ্যাগরিষ্ঠের দাপটে ও অহংকারে আমাদের একের পর এক বিআতের দিকে ঠেলে দিচ্ছে! আর আমরা বুলি আওড়াতে থাকছি, এত সব লোক কি ভুলে আছে?!”

কোন কোন জায়গায় এ জাতীয় বক্তব্য লিফলেট আকারেও প্রচার করা হয়। যথাযথ উত্তর দিয়ে বিভ্রান্তি দূর করার জন্য বিনীত আবেদন জানাচ্ছি।

উত্তর

وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته

بسم الله الرحمن الرحيم

হাদীস ও রাসূল সাঃ এর জীবানাচার সম্পর্কে অজ্ঞতা, সর্বোপরী ইসলামী ফিক্বহ সম্পর্কে মুর্খতার দরূন উক্ত ভাইটি প্রশ্নে উল্লেখিত অভিযোগগুলো উত্থাপন করেছেন।

দ্বীনী ইলম সম্পর্কে মুর্খতার সাথে সাথে তাবলীগ জামাতের প্রতি অন্ধ আক্রোশ এবং বিদ্বেষ মিলিয়ে অস্তিত্ব লাভ করেছে উপরের অভিযোগগুলো।

আলাদা আলাদাভাবে প্রতিটি প্রশ্নের উত্তর নিচে উদ্ধৃত করা হল।

১ম প্রশ্নের জবাব

রাসূল সাঃ কি কখনো মসজিদ রেখে মাঠে জুমআ আদায় করেননি?

রাসূল সা. যখন মক্কা থেকে মদীনায় হিজরত করেন, তখন মদীনা থেকে তিন মাইল দূরে আলীয়া বা কোবা নামক পল্লীতে কিছুদিন অবস্থান করেছিলেন। মদীনার উপকণ্ঠে এই পল্লীতে হুজুর সাঃ কয়েকদিন অবস্থান করেছিলেন। কুবায় অবস্থানকালে রাসূল সাঃ একটি মসজিদ নির্মাণ করেন। ‘মসজিদে কোবা’ নমের এই মসজিদটিই ছিল ইসলামের প্রথম মসজিদ। এরপর রাসূল সাঃ আবার মদীনার দিকে রওয়ানা করেন। পথিমধ্যে হুজুর সাঃ যখন বনী সালেম বিন আউফের উপত্যকায় এসে উপনীত হলেন, ততক্ষণে জুমার সময় হয়ে গেছে। মদীনার উপকণ্ঠের উক্ত উপত্যকায় তিনি জুমআর নামায আদায় করেন।  ইসলামের ইতিহাসে এটিই রাসূল সাঃ এর ইমামতিতে প্রথম জুমআ। যে স্থানটিতে জুমআ আদায় করা হয়েছিল, পরবর্তীতে সেখানে একটি মসজিদ নির্মাণ করা হয়। যা এখনও ‘মসজিদে জুমআ’ নামে খ্যাত হয়ে আছে। কিন্তু যখন রাসূল সাঃ তাকে জুমআর নামায আয়াদ করেন, তখন তা ছিল খালি ময়দান। ইতিহাসে এই প্রথম জুমআয় হুজুর সাঃ নিজে ইমামতি করেছিলেন, খুতবা ও দিয়েছিলেন।

فى معرفة السنن الآثار – وَرُوِّينَا عَنْ مُعَاذِ بْنِ مُوسَى بْنِ عُقْبَةَ، ومُحَمَّدِ بْنِ إِسْحَاقَ، «أَنَّ النَّبِيَّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ حِينَ رَكِبَ مِنْ بَنِي عَمْرِو بْنِ عَوْفٍ فِي هِجْرَتِهِ إِلَى الْمَدِينَةِ مَرَّ عَلَى بَنِي سَالِمٍ، وَبَنِي قُرَّةَ بَيْنَ قُبَاءَ، وَالْمَدِينَةِ فَأَدْرَكَتْهُ الْجُمُعَةُ فَصَلَّى فِيهِمُ الْجُمُعَةَ، وَكَانَتْ أَوَّلَ جُمُعَةٍ صَلَّاهَا رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ حِينَ قَدِمَ»

وفى البداية والنهاية- ولما ارتحل عليه السلام مِنْ قُبَاءَ وَهُوَ رَاكِبٌ نَاقَتَهُ الْقَصْوَاءَ وَذَلِكَ يَوْمَ الْجُمُعَةِ أَدْرَكَهُ وَقْتُ الزَّوَالِ وَهُوَ فِي دَارِ بَنِي سَالِمِ بْنِ عَوْفٍ، فَصَلَّى بِالْمُسْلِمِينَ الْجُمُعَةَ هُنَالِكَ، فِي وَادٍ يُقَالُ لَهُ وَادِي رَانُونَاءَ فَكَانَتْ أَوَّلَ جُمُعَةٍ صَلَّاهَا رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ بِالْمُسْلِمِينَ بِالْمَدِينَةِ، أَوْ مُطْلَقًا

মারেফাতুস সুনানে ওয়াল আসার, হাদীস নং-৬৩২০।

আলবিদায়া ওয়ান নিহায়া-  প্রথম হিজরীর ঘটনাপ্রবাহ অধ্যায়।

তাফসীরে কুরতুবী- সূরা জুমআ, আয়াত নং-৯

তাফসীরে খাজেন- সূরা জুমআ, আয়াত নং-৯

তাফসীরে কাশশাফ- সূরা জুমআ, আয়াত নং-৯

তাফসীরে রূহুল বয়ান- সূরা জুমআ, আয়াত নং-৯

তাফসীরে মাজহারী- সূরা জুমআ, আয়াত নং-৯

রাসূল সাঃ মদীনায় আগমন করার আগে মদীনায় কোন মসজিদ ছিল না একথা একজন সাধারণ মুসলমানও জানেন। রাসূল সাঃ মদীনায় আসার পর সর্বপ্রথম মসজিদ মসজিদে নববী নির্মাণ করেন। পথিমধ্যে কুবায় মসজিদে কুবা নির্মাণ করেছিলেন। কিন্তু মদীনায় আসার পর প্রথম মসজিদ নির্মাণ করেন মসজিদে নববী। কিন্তু রাসূল সাঃ রাসূল মদীনায় হিজরত করে আসার আগেই হযরত আস’আদ বিন জারারা রাঃ এর নেতেৃত্বে সাহাবাগণ মদীনায় জুমআর নামায আদায় করেছিলেন।

প্রশ্ন হল, সেই জুমআর নামায কি মসজিদে আদায় করা হয়েছিল? না মাঠে? মসজিদইতো নেই। সুতরাং জুমআ তখন মসজিদে আদায় করার প্রশ্ন করাটাই বোকামী হবে।

قَالَ ابْنُ سِيرِينَ: جَمَّعَ أَهْلُ الْمَدِينَةِ مِنْ قَبْلِ أَنْ يَقْدَمَ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ الْمَدِينَةَ، وَقَبْلَ أَنْ تَنْزِلَ الْجُمُعَةُ، وَهُمُ الَّذِينَ سَمَّوْهَا الْجُمُعَةَ، وَذَلِكَ أَنَّهُمْ قَالُوا: إِنَّ لِلْيَهُودِ يَوْمًا يَجْتَمِعُونَ فِيهِ، فِي كُلِّ سَبْعَةِ أَيَّامٍ يَوْمٌ وَهُوَ السَّبْتُ. وَلِلنَّصَارَى يَوْمٌ مِثْلَ ذَلِكَ وَهُوَ الْأَحَدُ فَتَعَالَوْا فَلْنَجْتَمِعْ حَتَّى نَجْعَلَ يَوْمًا لَنَا نَذْكُرُ اللَّهَ وَنُصَلِّي فِيهِ- وَنَسْتَذْكِرُ- أَوْ كَمَا قَالُوا- فَقَالُوا: يَوْمُ السَّبْتِ لِلْيَهُودِ، وَيَوْمُ الْأَحَدِ لِلنَّصَارَى، فَاجْعَلُوهُ يَوْمَ الْعَرُوبَةِ. فَاجْتَمَعُوا إِلَى أَسْعَدَ بْنِ زُرَارَةَ (أَبُو أُمَامَةَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ) فَصَلَّى بِهِمْ يَوْمَئِذٍ رَكْعَتَيْنِ وَذَكَّرَهُمْ، فَسَمَّوْهُ يَوْمَ الْجُمْعَةِ حِينَ اجْتَمَعُوا.

দ্রষ্টব্যঃ

তাফসীরে কুরতুবী- সূরা জুমআ, আয়াত নং-৯

তাফসীরে খাজেন- সূরা জুমআ, আয়াত নং-৯

তাফসীরে কাশশাফ- সূরা জুমআ, আয়াত নং-৯

তাফসীরে রূহুল বয়ান- সূরা জুমআ, আয়াত নং-৯

তাফসীরে মাজহারী- সূরা জুমআ, আয়াত নং-৯

শুধু তাই নয়, আরেকটি পরিস্কার হাদীসে এসেছে,

فَقُلْتُ لَهُ: يَا أَبَتَاهُ، أَرَأَيْتَكَ صَلَاتَكَ عَلَى أَسْعَدَ بْنِ زُرَارَةَ كُلَّمَا سَمِعْتَ النِّدَاءَ بِالْجُمُعَةِ لِمَ هُوَ؟ قَالَ: ” أَيْ بُنَيَّ، كَانَ أَوَّلَ مَنْ صَلَّى بِنَا صَلَاةَ الْجُمُعَةِ قَبْلَ مَقْدَمِ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ مِنْ مَكَّةَ، فِي نَقِيعِ الْخَضَمَاتِ، فِي هَزْمٍ مِنْ حَرَّةِ بَنِي بَيَاضَةَ، قُلْتُ: كَمْ كُنْتُمْ يَوْمَئِذٍ؟ قَالَ: أَرْبَعِينَ رَجُلًا “

হযরত আব্দুর রহমান বিন মালিক রাঃ তাঁর পিতাকে বলেন, আব্বাজান! আপনি জুমআর আজান শুনলেই কেন আস’আদ বিন যুরারা রাঃ এর জন্য ইস্তিগফার করেন? তিনি বললেন, হে বৎস! রাসূল সাঃ এর মক্কা থেকে [মদীনায়] আগমণের পূর্বে তিনি সর্বপ্রথম বনু বায়াজার প্রস্তরময় সমতল ভূমিতে অবস্থিত বাকীয়ে খাযামাত নামক স্থানে আমাদের নিয়ে জুমআর নামায আদায় করেন। আমি জিজ্ঞাসা করলাম, আপনারা তখন কতজন ছিলেন? তিনি বললেন, চল্লিশজন। {সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদীস নং-১০৮২ , মুসন্নাফে ইবনে আবী শাইবা, হাদীস নং-৩৫৪৬}

এবার অভিযোগ উত্থাপনকারী জাহিল ভাইয়ের কাছে আমাদের অনুরোধ থাকবে, কোন বিষয় সম্পর্কে না জানলে উলামায়ে কেরামের কাছে জিজ্ঞাসা করে নিন। অযথা নিজের অজ্ঞতাকে মহাজ্ঞান মনে করে ইহুদী খৃষ্টানদের মত ইসলামের বিরুদ্ধে, মুসলমানদের বিরুদ্ধে চোখ বন্ধ করে কলম তুলে যাচ্ছেতাই লিখবেন না। এতে করে নিজেও গোমরাহ হচ্ছেন, অন্যকেও গোমরাহ করছেন।

২য় প্রশ্নের জবাব

এই প্রশ্নটিও অভিযোগকারীর চূড়ান্ত অজ্ঞতার পরিচায়ক। ইসলামী ফিক্বহ সম্পর্কে অজ্ঞ ব্যক্তি ছাড়া এমন প্রশ্ন কেউ করবেন না। ইসলামী ফিক্বহের প্রথম শ্রেণীর ছাত্রও একথা জানে যে, মুসাফিরের উপর জুমআর নামায ওয়াজিব না হলেও যদি সে জুমআর নামায আদায় করে, তাহলে তার জুমআর নামায আদায় হয়ে থাকে। আবার জোহরের নামায আদায় করতে হয় না।

 إيَاسَ بْنَ أَبِي رَمْلَةَ، قَالَ:شَهِدْتُ مُعَاوِيَةَ يَسْأَلُ زَيْدَ بْنَ أَرْقَمَ: أَشَهِدْتَ مَعَ النَّبِيِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ عِيدَيْنِ اجْتَمَعَا فِي يَوْمٍ؟ قَالَ: نَعَمْ. قَالَ: فَكَيْفَ صَنَعَ؟ قَالَ: صَلَّى الْعِيدَ، ثُمَّ رَخَّصَ فِي الْجُمُعَةِ، فَقَالَ: «مَنْ شَاءَ أَنْ يُصَلِّيَ، فَلْيُصَلِّ»

হযরত আইয়াস বিন আবূ রামলা আশ শামী রহঃ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদা হযরত মুআবিয়া বিন আবু সুফিয়ান রাঃ হযরত জাযেদ বিন আরকাম রাঃ কে কিছু জিজ্ঞাসা করার সময় আমি সেখানে উপস্থিত ছিলাম। তিনি [মুআবিয়া রাঃ] বলেন, আপনি কি রাসূল সাঃ এর সময়ে তাঁর সাথে ঈদ ও জুমআ একই দিনে অনুষ্ঠিত হতে দেখেছেন? তিনি বলেন, হ্যাঁ। তিনি পুনরায় জিজ্ঞাসা করেন, তিনি [সাঃ] কিরূপে তা আদায় করেছেন? তিনি বলেন, নবী কারীম সাঃ প্রথমে ঈদের নামায আদায় করেন; তারপর জুমআর নামায আদায়ের ব্যাপারে অবকাশ প্রদান করে বলেনঃ “যে ব্যক্তি তা আদায় করতে চায়, সে তা আদায় করতে পারে।”

সুনানে দারেমী, হাদীস নং-১৬৫৩

সুনানে আবু দাউদ, হাদীস নং-১০৭০

সহীহ ইবনে খুজাইমা, হাদীস নং-১৪৬৪

এ হাদীস দ্বারা উদ্দেশ্য কি? ঈদের দিন আর জুমআর দিন একই দিনে হলে কি ঈদের নামায পড়ার পর জুমআর নামায পড়ার কোন দরকার নেই? একথাই কি রাসূল সাঃ বুঝাতে চেয়েছেন ?

মুহাদ্দিসীনে কেরাম লিখেছেন-

أَنَّ الْمُرَادِينَ بِالرُّخْصَةِ فِي تَرْكِ الْجُمُعَةِ فِي هَذَيْنِ الْحَدِيثَيْنِ هُمْ أَهْلُ الْعَوَالِي الَّذِينَ مَنَازِلُهُمْ خَارِجَةٌ عَنِ الْمَدِينَةِ مِمَّنْ لَيْسَتِ الْجُمُعَةُ عَلَيْهِمْ وَاجِبَةً ; لِأَنَّهُمْ فِي غَيْرِ مِصْرٍ مِنَ الْأَمْصَارِ , وَالْجُمُعَةُ فَإِنَّمَا تَجِبُ عَلَى أَهْلِ الْأَمْصَارِ،

অনুবাদঃ উক্ত দু’ হাদীসের মাঝে রাসূল সাঃ কর্তৃক জুমআ পড়া না পড়ার ইচ্ছেধিকার দেয়ার দ্বারা উদ্দিষ্ট হল ঐ সকল ব্যক্তি, যারা মদীনার বাইরে থেকে মদীনায় ঈদের নামায পড়তে এসেছিলেন। যাদের বসবাসের স্থান মদীনা নয়। যাদের উপর মূলত জুমআর নামায ফরজ নয়। কারণ তারা এসেছে অঁজপাড়া গাঁ থেকে। যেখানে জুমআর ফরজ নয়। কেননা, জুমআ শুধু শহরেই ফরজ হয়। {তাহাবী শরীফ, হাদীস নং-১১৫৪}

উক্ত হাদীস ও ব্যাখ্যা দ্বারা কি প্রতিভাত হল? রাসূল সাঃ পরিস্কার ভাষায় বুঝিয়ে দিলেন যে, গ্রাম থেকে আসা লোকদের উপর যেহেতু জুমআর নামায পড়া আবশ্যক নয়, তাই তারা জুমআ না পড়েই গ্রামে ফিরে যেতে পারে। কিংবা ইচ্ছে করলে জুমআর নামায পড়তেও পারে।

এ ইচ্ছেধিকার দেয়া কি প্রমাণ করছে না যে, জুমআর নামায আবশ্যক না হলেও যদি কেউ আদায় করে, তাহলে তার জুমআর নামায আদায় হবে?

জুমআ আবশ্যক না হলেও যদি কেউ তা আদায় করে, তাহলে তার জুমআর নামায আদায় হয় না, এমন কোন জঈফ বর্ণনাও কি অভিযোগকারী ভাইটি দেখাতে পারবেন?

অভিযোগকারী যেভাবে টঙ্গির ময়দানে একত্র হওয়া সবাইকে মুসাফির বানিয়ে দিল, তাতে পরিস্কার লোকটির মুসাফির ও সফর সংক্রান্ত সামান্যতম কোন জানাশোনাই নেই। লোকটির কাছে আমাদের প্রশ্ন-

আর টঙ্গির ময়দানে ঢাকা শহরের যে সকল মুসল্লিগণ একত্র হয়েছেন, তারাও কি মুসাফির নাকি?

যারা ঢাকার নিকটতম এলাকা থেকে তথা সফরের দূরত্ব থেকে কম দূরত্বপূর্ণ এলাকা সফর করে এসেছেন, তারাও কি মুসাফির নাকি?

যারা টঙ্গির ময়দানে ১৫ দিনের উপরে অবস্থান করার নিয়ত করেছেন, তারাও কি মুসাফির নাকি?

৩ নং প্রশ্নের জবাব

এ অভিযোগটির জবাব ২ নং প্রশ্নের জবাবেই অতিক্রান্ত হয়েছে। হাদীস ও ফিক্বহ সম্পর্কে অজ্ঞতার কারণে তিনি এমন প্রশ্ন উত্থাপন করেছেন। অঁজপাড়া গাঁয়ে জুমআর নামায ফরজ নয়। কিন্তু সেই গাঁয়ের লোকটি যদি শহরে চলে আসে। তাহলে সে যদি জুমআর নামায শহরে আদায় করে তাহলে তার নামায হয়ে যাবে। যেমন ২ নং প্রশ্নের উত্তরে হাদীসে উদ্ধৃত হয়েছে।

হানাফী ফিক্বহের কিতাব থেকে রেফারেন্স দেয়া হল-

فى البحر الرائق، ومن لا جمعة عليه إن اداها جاز عن فرض الوقت…… ويسقط عنهم الظهر، (البحر الرائق، كتاب الصلاة، باب صفة الصلاة الجمعة-2/152)

শুধু তাই নয়, জুমআর নামায অঁজপাড়াগাঁয়ের লোকদের উপর ফরজ না হওয়া সত্বেও গ্রামের লোকজন স্বীয় গ্রাম থেকে রাসূল সাঃ সাথে জুমআর নামায পড়ার জন্য মদীনা শহরে আসতো। হাদীসে এসেছে-

عَنْ عَائِشَةَ، أَنَّهَا قَالَتْ: كَانَ النَّاسُ يَنْتَابُونَ الْجُمُعَةَ مِنْ مَنَازِلِهِمْ مِنَ الْعَوَالِي،

হযরত আয়শা রাঃ থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, লোকজন তাদের বাড়িঘর থেকে এবং মদীনার উপকণ্ঠ থেকে জুমআর নামায পড়তে আসতো। {সহীহ মুসলিম, হাদীস নং-৮৪৭, সুনানে আবু দাউদ, হাদীস নং-১০৫৫, সহীহ ইবনে হিব্বান, হাদীস নং-১২৩৭}

সাহাবায়ে কেরামের আমল অনুসরণ করাতে যদি কারো খারাপ লেগে থাকে তাহলে আমাদের কী আর করা আছে? যেখানে সাহাবাগণ তাদের উপর জুমআর নামায ফরজ না হওয়া সত্বেও শহরে এসে জুমআর নামায পড়তেন। সেখানে নিজের অজ্ঞতাবশতঃ এমন উদ্ভট প্রশ্ন উত্থাপনকারীর ব্যাপারে আমরা শুধু আফসোসই করতে পারি। এছাড়া আমাদের আর কী’বা করার আছে?

আল্লাহ তাআলা এসব মুর্খদের হাত থেকে জাতিকে হিফাযত করুন।

৪ নং প্রশ্নের উত্তর

এ প্রশ্নটিও একটি জাহালাতপূর্ণ এবং বিদ্বেষপূর্ণ অভিযোগ। এর কোন বাস্তবতা নেই।

মুসাফিরের ক্ষেত্রে মাসআলা হল, যদি তিনি একাকী নামায পড়েন, কিংবা তিনি নিজে ইমামতী করে নামায পড়ান, কিংবা মুসাফিররা একত্র হয়ে জামাত করে, তাহলে তারা কসর করবে। চার রাকাতওয়ালা নামায পূর্ণ আদায় করলে নামায আদায় হবে না। বরং দুই রাকাত পড়তে হবে।

কিন্তু মুসাফির ব্যক্তি যদি মুকীম ইমামের পিছনে ইক্তিদা করে, তাহলে সে পূর্ণ নামাযই আদায় করবে ইমামের ইক্তিদা করে। দুই রাকাত পড়ে সালাম ফিরাবে না।

রাসূল সাঃ থেকে কিংবা কোন সাহাবী থেকে কোন একটি বর্ণনাও কেউ দেখতে পারবে না যে, যাতে কোন মুসাফির সাহাবী মুকীম ইমামের পিছনে ইক্তিদা করে নামায পড়াকালে দুই রাকাত নামায পড়ে সালাম ফিরিয়ে ফেলেছেন।

তাহলে এরকম অজ্ঞতাসূচক প্রশ্নের হেতু কি?

লোকটি কি কোন একটি প্রমাণ দেখাতে পারবে যে, টঙ্গির ইজতিমায় আগমনকারী কোন মুসাফির ব্যক্তি একাকী নামায পড়েছে, অথচ চার রাকাত নামায বিশিষ্ট নামাযে চার রাকাতই পড়েছে?

না জেনে, এরকম অহেতুক প্রতারণামূলক ধারণা করা কি সওয়াবের কাজ না গোনাহের কাজ?

একারণেই আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন-

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اجْتَنِبُوا كَثِيرًا مِنَ الظَّنِّ إِنَّ بَعْضَ الظَّنِّ إِثْمٌ

হে ঈমানদারগণ! তোমরা অযথা ধারণা থেকে বেঁচে থাক। নিশ্চয় কতিপয় ধারণা হল পাপ। {সূরা হুজুরাত-১২}

অহেতুক ধারণা থেকে বেঁচে থাকতে মুমিনদের আল্লাহ আদেশ দিয়েছেন। মিথ্যা অভিযোগকারী ভাইটি মুমিন হলে আশা করি এসব অহেতুক অপবাদমূলক ধারণা থেকে নিজেকে বাঁচিয়ে রাখবেন।

৫ নং অভিযোগের জবাব

এটিও বিদ্বেষসূক অভিযোগ। কোন বাস্তবতা নেই এ অভিযোগের। ইজতিমার কোন একটি বয়ানের অংশ কি কেউ দেখতে পারবে যে, যাতে বলা হয়েছে, লোকেরা যেন মসজিদের জামাত রেখে টঙ্গির মাঠে এসে জামাত করে?

একথা অভিযোগকারী কোথায় পেল? নাকি বসে বসে তাবলীগের বিরুদ্ধে হিংসা আর বিদ্বেষে জ্বলতে জ্বলতে নিজে নিজেই এসব আবিস্কার করেছেন? নিশ্চয় লোকটির তাবলীগ বিরোধী হিংসাত্মক মন প্রসব করে চলেছে একের পর মিথ্যা অপবাদ। যার কোন বাস্তবতা কেউ কোনদিন দেখাতে পারবে না ইনশাআল্লাহ।

জামাতের সাথে নামায পড়লে ২৭গুণ সওয়াব হবে একথা স্পষ্ট ভাষায় হাদীসে বর্ণিত হয়েছে। [বুখারী, মুসলিম] তবে মসজিদে নামায পড়া যে উত্তম একথা কেউ অস্বিকার করতে পারবে না। আর তাবলীগের মেহনতটাই হল, ঘরে নামায না পড়ে, মসজিদে এসে নামায পড়ার মেহনত। সেখানে এ জাহিলী অভিযোগের কি মানে হয়?

আল্লাহ তাআলা এসব হিংসুকদের মিথ্যাচার থেকে সরলপ্রাণ মুসলিমদের হিফাযাত করুন। তাবলীগের ইজতিমাকে কবুল করুন। পৃথিবীর প্রান্তে প্রান্তে ছড়িয়ে দিন দ্বীনে হক্বের প্রদীপ্ত আলো। আমীন। ছুম্মা আমীন।

والله اعلم بالصواب

উত্তর লিখনে

লুৎফুর রহমান ফরায়েজী

পরিচালক-তালীমুল ইসলাম ইনষ্টিটিউট এন্ড রিসার্চ সেন্টার ঢাকা।

ইমেইল- ahlehaqmedia2014@gmail.com

lutforfarazi@yahoo.com

Print Friendly, PDF & Email

এটাও পড়ে দেখতে পারেন!

তারাবীহ সালাতের চার রাকাত পর বসে প্রচলিত “সুবহানা জিলমুলুকি ওয়ালমালাকুতু” যে দুআ পড়া হয় এর কোন ভিত্তি আছে কি?

প্রশ্ন আসসালামু আলাইকুম ওয়ারাহমাতুল্লাহি ওয়াবারকাতুহ। ১) তারাবীহ নামাজের চার রাকাত পর পর কোন দোয়া পড়া …